৩০ জুন ২০২৬ প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা, অগ্রগতি মাত্র ৫৩ শতাংশ;
লিফট, এসি ও ফার্নিচার ক্রয়ে কোটি কোটি টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের আগারগাঁওয়ে নির্মাণাধীন রপ্তানি উন্নয়ন ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয়, কাজের অগ্রগতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন সামনে আসছে। তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৮২ কোটি ৫ লাখ ৬২ হাজার টাকা ব্যয়ে ভবন নির্ম্মানের এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৫৩ শতাংশ এবং ই/এম কাজের অগ্রগতি ৫০ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। অথচ ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে ১১৭ কোটি ২১ লাখ ২১ হাজার ৮৬৮ টাকা।
প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের পরিমাণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভবন নির্মাণ কাজ বাবদ ১৫৬ কোটি ৬০ লাখ ৯২ হাজার টাকা, কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাবদ ৩৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, ৮টি লিফট স্থাপনে ৭ কোটি ৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা, বিশেষ লাইটিং, সিসিটিভি, অগ্নি নির্বাপন, সোলার সিস্টেম ও বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কাজে ১৪ কোটি ২২ লাখ ৯২ হাজার টাকা এবং ফার্নিচার বাবদ ৩ কোটি ১৯ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বরাদ্দ বা ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।
এত বিপুল ব্যয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবাগুলো বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্যে ক্রয় করা হয়েছে কিনা। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, লিফট, ডিজিটাল কনফারেন্স সিস্টেম, বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও ফার্নিচার ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কিনা এবং সরকারি ক্রয়বিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রকল্পের কাজ মাত্র অর্ধেক পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে গুরুতর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, ভবিষ্যতে সময় বৃদ্ধি এবং সেই সঙ্গে ব্যয় বৃদ্ধি করার কোনো পরিকল্পনা বা দূরভিসন্ধি রয়েছে কিনা। অতীতে দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সময় বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যয় বাড়ানোর নজির থাকায় এ প্রকল্পেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রয়োজনের আগেই ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি, ফার্নিচার বা অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয় করা হয়েছে কিনা। ভবনের মূল কাঠামোগত কাজ এখনও সম্পূর্ণ না হলেও বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সংশ্লিষ্ট মালামাল প্রকৃত প্রয়োজনের সময় অনুযায়ী ক্রয় করা হয়েছে কিনা, নাকি আগেভাগে ক্রয় দেখিয়ে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে—সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক ধীরগতির কারণ নিয়েও অনুসন্ধান প্রয়োজন। কাজের বিলম্বের পেছনে শুধুই প্রশাসনিক বা কারিগরি কারণ রয়েছে, নাকি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী, পরামর্শক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বিত অনিয়ম বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পর্ক কাজ করছে—সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ দীর্ঘসূত্রিতা যত বাড়ে, সময় বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগও তত বাড়ে।
জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পরিকল্পনা কমিশন, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রকল্পটির ব্যয়, ক্রয় প্রক্রিয়া, কাজের অগ্রগতি, সময় বিলম্বের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের ভূমিকা নিয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা প্রয়োজন। জনগণের অর্থে পরিচালিত এই প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম, অপচয় বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।