বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বোর্ডে আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন, তদন্ত ও সংস্কারের দাবি
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে বিপুল সংখ্যক আমলার উপস্থিতি, একই ব্যক্তির একাধিক বোর্ডে দায়িত্ব পালন এবং এসব দায়িত্বের বিপরীতে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব অ্যাডভোকেট মোঃ ইয়ারুল ইসলাম।
তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে এবং প্রশাসনের প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি হবে।
এক বিবৃতিতে ইয়ারুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদে কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের প্রাধান্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি একাধিক বোর্ডে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এসব দায়িত্বের জন্য আলাদা আলাদা সম্মানী ও অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করছেন। এতে একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ক্ষমতা ও প্রভাব একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কাজ জনগণের সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন একই ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন, তখন স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন ওঠে। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে এমন ব্যবস্থা কতটা যৌক্তিক, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”
বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিবের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এ খাতের পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, বোর্ড সদস্য নিয়োগ, সম্মানী নির্ধারণ, সভা ভাতা, বিদেশ সফর এবং অন্যান্য সুবিধা প্রদানের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা ও জনসম্মুখে তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা থাকা উচিত।
ইয়ারুল ইসলাম বলেন, “কোনো কর্মকর্তা বা আমলা রাষ্ট্রের মালিক নন। তারা জনগণের করের অর্থে পরিচালিত প্রশাসনের কর্মচারী। তাই জনগণের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং সেই ব্যয় কতটা যৌক্তিক, তা জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, প্রশাসনিক সংস্কারের কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সংস্কারের পরিবর্তে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে প্রশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার সংকট দূর হচ্ছে না। তিনি বলেন, “প্রশাসন সংস্কার যদি সত্যিই করতে হয়, তাহলে সেটি জনগণের স্বার্থে হতে হবে। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য নয়।”
নির্বাচন ব্যবস্থা প্রসঙ্গেও তিনি মন্তব্য করেন যে, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু অতীতে বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রবণতা দেখা গেছে। এতে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। প্রশাসন যদি নির্বাচন পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা পালন করে, তাহলে ভোটারদের আস্থা ও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”
ইয়ারুল ইসলাম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসহ রাষ্ট্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বোর্ড সদস্য নিয়োগে যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন, একই ব্যক্তির একাধিক বোর্ডে দায়িত্ব পালনের সীমা নির্ধারণ, সম্মানী ও অন্যান্য সুবিধার যৌক্তিক কাঠামো নির্ধারণ, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং সংসদীয় তদারকি জোরদারের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বিশেষ সুবিধাভোগ, অস্বচ্ছতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধে প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, কার্যকর নীতিমালা এবং বাস্তবমুখী সংস্কার। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে জনগণের স্বার্থই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কাঠামো, বোর্ড সদস্যদের নিয়োগ ও আর্থিক সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে।