গত কয়েক বছর ধরে যেখানে গড় পাসের হার ৮০ শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছিল, সেখানে এবারের ফলাফলকে শিক্ষাবিদরা ‘বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করছেন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে সর্বোচ্চ পাসের হার ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। সবচেয়ে কম পাসের হার কুমিল্লা বোর্ডে, মাত্র ৪৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
অন্যান্য বোর্ডে ফলাফল:
বরিশাল: ৬২.৫৭%
রাজশাহী: ৫৯.৪০%
দিনাজপুর: ৫৭.৪৯%
চট্টগ্রাম: ৫২.৫৭%
সিলেট: ৫১.৮৬%
ময়মনসিংহ: ৫১.৫৪%
যশোর: ৫০.২০%
এছাড়া ২০২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ব্যাপকভাবে কমেছে—গত বছরের দেড় লাখের বেশি থেকে এবার মাত্র ৬৯ হাজার ৯৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ—
ঘন ঘন শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন,
দক্ষ শিক্ষকের অভাব,
পরীক্ষা মূল্যায়নে কঠোরতা,
এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব জ্ঞানচর্চায় ঘাটতি।
কুমিল্লার হোমনা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক তবারক উল্লাহ বলেন, “ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে, যা সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।” মাগুরার শিক্ষক আশিষ কুমার বিশ্বাস মনে করেন, “মোবাইল ও এআই নির্ভর সংক্ষিপ্ত পড়াশোনা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া গ্রেস মার্ক বন্ধ থাকায় অনেকেই ফেল করেছে।” অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি. আর. আবরার বলেন, “এবার শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্য নম্বরই পেয়েছে। এখন থেকে কেউ বাড়তি বা কম নম্বর পাবে না।” তিনি যোগ করেন, “আমরা এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করেছি যেখানে পাসের হারই সাফল্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু শেখার প্রকৃত সংকট আড়াল করা হয়েছে। এখন শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করছে।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, “এতদিন যে ভালো ফলাফল দেখা গেছে তা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ছিল। এবার আমরা শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র দেখছি।” শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন,
“ফল ভালো বা খারাপ—এটা একমাত্র মাপকাঠি নয়। শিক্ষার্থীরা যা শেখার কথা, তারা সেটি কতটা শিখছে, সেটাই আসল প্রশ্ন।”
২০০৫ সালের পর থেকেই এইচএসসিতে পাশের হার ধারাবাহিকভাবে ৬০ শতাংশের ওপরে ছিল। করোনা মহামারির সময় শতভাগ অটোপাশ এবং পরবর্তীতে ৮৫–৯৫ শতাংশ পর্যন্ত পাসের হার দেখা গিয়েছিল। গত বছরও (২০২৪) পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ—তার তুলনায় এবারের ফলাফল প্রায় ১৯ শতাংশ কম। শিক্ষাবিদদের মতে, এ বছরের ফলাফল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করে প্রকৃত মূল্যায়ন চালু হওয়ায় শিক্ষার গুণগত ঘাটতি সামনে এসেছে।
তারা বলছেন, এখন সময় এসেছে রাজনৈতিক সাফল্যের হিসাব নয়, শেখার মানোন্নয়নের বাস্তব পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার।