মোঃ বুলবুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম : সারাদেশে সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলনের বলি হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। কুড়িগ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা গ্রহণ কার্যক্রম চললেও সরকারি মাধ্যমিকে গত দুই দিন ধরে বার্ষিক পরীক্ষা গ্রহণ বন্ধ রেখেছেন সহকারী শিক্ষকরা। জেলার সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে খোঁজ নিয়ে এমন তথ্য জানা গেছে।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারাদেশে শিক্ষকদের ডাকা আন্দোলনে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরা একত্মতা জানালেও শিশু শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১ ডিসেম্বর থেকে বার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন সহকারী শিক্ষকরা। তবে চিলমারী ও রৌমারী উপজেলার কয়েকটি স্কুলে পরীক্ষা নেওয়া নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। রৌমারীতে কয়েকটি স্কুলে শিক্ষা অফিসার ও অভিভাবকরা দায়িত্ব পালন করে পরীক্ষা নিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
জেলার রৌমারী উপজেলার রৌমারী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সহকারী শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে গেলেও তারা পরীক্ষা কার্যক্রমে অংশ না নিয়ে লাইব্রেরিতে অবস্থান করেন। পরিস্থিতির বাস্তবতায় উপজেলার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমুল করিম প্রধান শিক্ষক ও অবিভাবকদের সাথে নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে নিয়েছেন।
জেলার সদর, ফুলবাড়ী ও রাজারহাট উপজেলার বেশ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সহকারী শিক্ষাকরা বার্ষিক পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্য কর্মবিরতির ছবি পোস্ট করা হলেও প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষায় শিক্ষকরা দায়িত্ব পালন করেছেন।
ফুলবাড়ী ও রাজারহাট উপজেলার একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে আন্দোলনের ডাক দেওয়ায় শিক্ষকদের নীতি নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও পড়ালেখার কথা বিবেচনায় প্রায় সব স্কুলেই সহকারী শিক্ষকরা পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু শিক্ষক নেতা নামধারী কিছু শিক্ষক যারা নিয়মিত শিক্ষা অফিসগামী ও রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত তারাই আন্দোলনের নামে বাড়াবাড়ি করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফুলবাড়ী উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘ আমাদের উপজেলায় সব স্কুলেই শিক্ষকরা পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীরা তো আমাদের ক্ষতি করেনি। তাদের শিক্ষার ক্ষতি করে আমরা জীবিকা নির্বাহ করবো এটা হতে পারে না। তাই তারা পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন। ফেসবুকে কর্মবিরতির ছবি দিলেও পরীক্ষা নিচ্ছেন।
পরীক্ষা জিম্মি করে এমন আন্দোলনের সমালোচনা করে এই প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, ‘ পরীক্ষা চলাকালীন এমন আন্দোলনের ডাক দেওয়ায় সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের কাছে আমাদের অবস্থান অনেক নিচে নেমে গেছে। পাবলিক পারসেপশন একেবারে শিক্ষকদের বিপক্ষে। আমাদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষের সমর্থন নেই। দুই চারজন শিক্ষক নেতার কথায়তো ডিপার্টমেন্ট চলতে পারে না।
প্রাথমিকে পরীক্ষা চললেও সরকারি মাধ্যমিকে পরীক্ষাগ্রহণ স্থগিত রয়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছে হাজারো শিক্ষার্থী। গত ২৪ নভেম্বর বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়। চার বিষয়ে পরীক্ষা হওয়ার পর গত ১ ডিসেম্বর থেকে আন্দোলনের নামে কর্মবিরতিতে চলে যান সহকারী শিক্ষকরা। ফলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাতেও অনির্দিষ্টকালের বিরতি শুরু হয়।
কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, উলিপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ জেলার সরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পরীক্ষার রুটিনে সোমবার ও মঙ্গলবার পরীক্ষা থাকলেও সরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে কোনও পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্কুলে গেলেও পরীক্ষা না দিয়ে ফিরে গেছে।
কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক বলেন, ‘ আমরা চরম বৈষম্যের শিকার । আমাদের প্রতিটি দাবি ন্যায্য। আমাদের আন্দোলন কারও বিরুদ্ধে নয়, এটা শিক্ষাক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর আন্দোলন। সরকারের উচিৎ আমাদের দাবি মেনে নেওয়া। শিক্ষক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা বার্ষিক পরীক্ষা নেওয়া বন্ধ রেখেছি। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আন্দোলন চলবে।
জেলা শিক্ষা অফিস বলছে, জেলায় ১০ টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে সোমবার ৮ বিদ্যালয়ে পরীক্ষা বন্ধ ছিল। মঙ্গলবার নতুন করে সরকারি হওয়া ৫ টি বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা নেওয়া হলেও পূর্বের সরকারি বিদ্যালয়সহ বাকি ৫ টি বিদ্যালয়ে পরীক্ষা বন্ধ ছিল।
জেলা শিক্ষা অফিসার শফিকুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসনসহ আমরা স্কুলগুলোর শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। কিন্তু তারা শিক্ষক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্দেশনার কথা বলছেন। কয়েকটি স্কুলে পরীক্ষা নেওয়া হলেও সদরের দুটি সরকারি স্কুলসহ ৫ টি স্কুলে পরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘ সদরের দুটি সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সভাপতি হিসেবে শিক্ষকদের সাথে আমি বৈঠক করেছি। তারা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নেবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে এভাবে আন্দোলন করা বিধিসম্মত নয়। কিন্তু শিক্ষকরা বলছেন যে এই আন্দোলন তাদের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।’