অধ্যাপক ড. আসিফ মিজান:
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ ও বিবর্তনবাদ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জনবিচ্ছিন্ন স্বৈরাচারী শক্তি সবসময়ই জনপ্রিয় ও গণমুখী নেতৃত্বকে অবদমন করতে আইনি কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুপরিকল্পিত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে তৎকালীন অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিচার বিভাগ ও আইনি প্রক্রিয়াকে কলুষিত করে, আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে একটি ‘ম্যাটিকুলাসলি ডিজাইনড ব্লুপ্রিন্ট’ বা সূক্ষ্ম নীলনকশার মাধ্যমে জনতার রাষ্ট্রনায়ককে রাষ্ট্রহীন করার এক চরম ঘৃণ্য অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিলেন। অত্যন্ত অমানবিক, নিপীড়নমূলক ও প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারম্যান এবং বর্তমান সফল প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এমপি-কে নির্বাসিত করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস অমোঘ এবং নির্মম; ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—ভৌগোলিক দূরত্ব তৈরি করে জনতার হৃদয় থেকে কোনো খাঁটি জননেতাকে কস্মিনকালেও বিচ্ছিন্ন করা যায় না। সুদূর প্রবাসে থেকেও তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার কোটি কোটি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ক্রান্তিকালের প্রধান রাজনৈতিক দিশারি ও দিকনির্দেশক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
ফ্যাসিস্ট সরকার যখন তাদের দোসরদের নিয়ে এদেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক কাঠামোকে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল; যখন বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের মতো রাষ্ট্রের মৌলিক স্তম্ভগুলোকে সম্পূর্ণ দলীয়করণ করে একে একে ভেঙে ফেলা হচ্ছিল, ঠিক তখনই বাংলাদেশের মানুষের সামগ্রিক মুক্তির সনদ হিসেবে আবির্ভূত হয় ঐতিহাসিক ‘৩১ দফা’। জনাব তারেক রহমানের দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বে বিএনপি এবং সমমনা গণতান্ত্রিক দলগুলোর ঘোষিত এই ‘রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা’ দেশের চরম হতাশাগ্রস্ত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের মাঝে এক নতুন আশার আলো সঞ্চার করে। এই আধুনিক উন্নয়ন রূপরেখায় সাধারণ জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত ও বিপুল সমর্থন জোগালে স্বৈরাচারী সরকার পুনরায় ক্ষমতার ভিত নড়ে ওঠার আশঙ্কায় ভীত হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে, তারা আবারও বিচার বিভাগকে নগ্নভাবে প্রভাবিত করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনাব তারেক রহমানের বক্তব্য, বিবৃতি ও রাজনৈতিক চিন্তা প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম এবং ইতিহাসের অনিবার্য সত্যকে কোনো বুলেট, দমন-পীড়ন কিংবা আইনি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে চিরকাল স্তব্ধ করে রাখা যায় না। ২০২৪ সালের রক্তঝরা জুলাইয়ে এদেশের ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব, রক্তক্ষয়ী ও ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান এবং বীর শহীদদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে সেই দুঃসহ ফ্যাসিবাদী শাসনের চিরঅবসান ঘটে। মানবতার চরম লঙ্ঘনকারী ফ্যাসিস্ট হাসিনা গণরোষ থেকে বাঁচতে দেশ থেকে পলায়নের পথ খুঁজতে থাকেন। কিন্তু যখন বিশ্বের কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে রাজি হচ্ছিল না, তখন তাঁর অবৈধ ক্ষমতার দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র ভারতে তিনি গোপনে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ এবং এক নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।
দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর সমগ্র দেশবাসী গভীর অধীরতা ও পরম আবেগে অপেক্ষা করছিল তাঁদের প্রিয় নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক মুহূর্তটির জন্য। সমস্ত আইনি প্রতিবন্ধকতা, ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ও রাজনৈতিক বাধা পেরিয়ে জনাব তারেক রহমান যখন প্রিয় মাতৃভূমির মাটিতে পা রাখলেন, তখন ঢাকাসহ সারা দেশজুড়ে তাঁকে স্বাগত জানাতে সৃষ্টি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন জনসমুদ্র। সেই ঐতিহাসিক ক্ষণে জনসমক্ষে তিনি সংক্ষেপে কিন্তু অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছিলেন—"I have a plan" (আমার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে)।
প্রাথমিকভাবে কিছু সংশয়বাদী সমালোচক বা স্বার্থান্বেষী মহল এই সুপ্ত পরিকল্পনা নিয়ে নানা নেতিবাচক বা অদূরদর্শী মন্তব্য করলেও, সময় যত গড়াচ্ছে, সেই অব্যক্ত মাস্টারপ্ল্যানের এক একটি প্রগতিশীল দিক উন্মোচনে দেশবাসী আজ অবাক বিস্ময় ও গভীর ভালবাসায় তা প্রত্যক্ষ করছে। বর্তমান দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এমপি এখন একটার পর একটা গণমুখী, আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন, যা এদেশের আমজনতার অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বপ্নপূরণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে।
জনকল্যাণমুখী রূপান্তর ও প্রশাসনিক সংস্কারের নতুন দিগন্তঃ উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সেবার সুফল যেন কোনো প্রকার মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া সরাসরি প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, সেজন্য তাঁর সরকার সমাজ পরিবর্তনের কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে:
ফ্যামিলি কার্ড: দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সুষম বণ্টন বজায় রাখার এক অনন্য কল্যাণকামী প্রয়াস।
কৃষি কার্ড: দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও প্রাণভোমরা কৃষকদের অধিকার রক্ষা, আধুনিকায়ন এবং সরাসরি রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি নিশ্চিত করার এক ডিজিটাল ও যুগোপযোগী রূপরেখা।
তবে কেবল দৃশ্যমান অর্থনৈতিক সুবিধাই নয়, প্রশাসনিক সংস্কার ও শুদ্ধাচারের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান যে অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক বৈপ্লবিক ও গুণগত পরিবর্তন এনেছে। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সরকারিভাবে কঠোর ও অলঙ্ঘনীয় নির্দেশনা জারি করেছেন যে—প্রধানমন্ত্রীর ছবি টাঙিয়ে বা ব্যক্তিপূজা করে আর কোনো সরকারি সভা-সমাবেশ, সেমিনার বা প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা করা যাবে না।
মেধাতন্ত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধাচারের যুগান্তকারী সূচনাঃ এই ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক তাৎপর্য রয়েছে। অতীতে আমরা বিগত शाশাসনামলগুলোতে দেখেছি, কীভাবে চাটুকারিতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক তোষামোদি, স্তাবকতা এবং ছবি প্রদর্শনের অন্ধ সংস্কৃতির আড়ালে অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও অন্যায্য পদোন্নতি লুটে নিয়েছে, যা মেধার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছিল। বর্তমান প্রজ্ঞাবান প্রধানমন্ত্রীর এই সাহসী ও বিপ্লবী পদক্ষেপের মূল বার্তা মূলত দুটি:
১. মেধাতন্ত্রের (Meritocracy) সুপ্রতিষ্ঠা: চাটুকারিতা বা রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি নয়; সম্পূর্ণ যোগ্যতা, সততা ও মেধার ভিত্তিতেই সরকারি কর্মকর্তা-করেমচারীদের কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে হবে এবং কর্মদক্ষতার মূল্যায়নস্বরূপ পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে।
2. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: ব্যক্তিকেন্দ্রিক তোষামোদির সংস্কৃতিকে চিরতরে সমাহিত করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদারিত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক শুদ্ধাচার ফিরিয়ে আনা।
স্বপ্নের ঠিকানায় আগামীর বাংলাদেশঃ একজন অপরাধ বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—যেকোনো রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতা এবং সুশাসন দীর্ঘস্থায়ী হওয়া নির্ভর করে তার প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধাচার ও আইনি কাঠামোর নিরপেক্ষতার ওপর। প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান তাঁর সুচিন্তিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যক্তিপূজার চিরচেনা জরাজীর্ণ সংস্কৃতি ভেঙে একটি আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক, সাম্যবাদী ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলছেন। অতীতে ছবির আড়ালে এবং ক্ষমতার প্রভাবে যে অন্যায়, দুর্নীতি ও অবৈধ সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসেছিল, তা ইনশাল্লাহ বর্তমান সরকারের সুদৃঢ় প্রত্যয়ে চিরতরে অবলুপ্ত হতে চলেছে।
জনতার আপসহীন নেতা থেকে আজ রাষ্ট্রের মূল অভিভাবক ও যোগ্য কর্ণধারে পরিণত হওয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এমপি'র এই সুদূরপ্রসারী ‘প্ল্যান’ বা রাষ্ট্র মেরামতের মহাপরিকল্পনাই বৈষম্যহীন, আধুনিক, প্রগতিশীল ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেগশ বিনির্মাণের একমাত্র রাজপথ। এই আলোকময় পথ ধরেই বাংলাদেশ খুব দ্রুত পৌঁছাবে তার কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতির চূড়ান্ত শিখরে এবং আমজনতার স্বপ্নের স্বাধীন ঠিকানায়।
লেখকঃ - অধ্যাপক ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।