প্রফেসর ড. আসিফ মিজান:
সমকালীন বিশ্বব্যবস্থায় একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের টিকে থাকা, পতন কিংবা পুনরুত্থানের সমীকরণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজতাত্ত্বিক এবং অপরাধবিজ্ঞানীদের চিরকালই এক গভীর তাত্ত্বিক ভাবনায় নিমগ্ন করেছে। প্রচলিত নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলো প্রায়শই সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক, জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য দিয়ে একটি দেশের সামগ্রিক শক্তি ও স্থায়িত্ব পরিমাপ করতে চায়। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ গতিপথ বলে, কেবল বাহ্যিক বস্তুগত উপাদান কোনো রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অস্তিত্বের নিশ্চয়তা হতে পারে না। সংকটের চরম মুহূর্তে রাষ্ট্রকে যা ভেতর থেকে খণ্ডবিখণ্ড হওয়া থেকে টিকিয়ে রাখে, তা হলো তার প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান-কাঠামো (Institutional Knowledge Infrastructure) এবং সামষ্টিক মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজি (Cultural Capital)। এই সমাজতাত্ত্বিক সত্যের সবচেয়ে সমকালীন এবং জীবন্ত ল্যাবরেটরি হলো লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের নিরিখে বর্তমান আর্জেন্টিনা এক দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি, জাতীয় মুদ্রার ক্রমাগত অবমূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) ঋণ-ফাঁদ দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতিকে বারবার প্রান্তিক সীমানায় ঠেলে দিচ্ছে। অপরাধবিজ্ঞানের (Criminology) দৃষ্টিতে, এমন তীব্র অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতা যেকোনো সমাজেই চরম নৈরাজ্য, সামাজিক অপরাধের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং শেষ বিচারে সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ভাঙন (State Collapse) ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট অনুঘটক। অথচ, বিশ্বরাজনীতির সমস্ত নেতিবাচক পূর্বাভাস ও তাত্ত্বিক মডেলকে ভুল প্রমাণিত করে আর্জেন্টিনা এখনো কেবল টিকেই নেই, বরং তারা বৈশ্বিক মঞ্চে লড়ে যাচ্ছে এবং সামূহিক সামাজিক বিপর্যয়কে রুখে দিচ্ছে।
কী সেই অদৃশ্য অথচ অভেদ্য শক্তি, যা এই ভঙ্গুর অর্থনীতির ভেতরেও রাষ্ট্রটিকে এক সুদৃঢ় সামাজিক চুক্তিতে একীভূত করে রেখেছে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে দেশটির দীর্ঘদিনের শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক জ্ঞান–অবকাঠামো এবং উচ্চশিক্ষিত, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচেতন নাগরিকসমাজের ভেতর।
বৌদ্ধিক জ্ঞান-অবকাঠামো: সংকটের ঢালঃ আর্জেন্টিনার টিকে থাকার প্রধানতম মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত স্তম্ভ হলো তার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা। মর্যাদাপূর্ণ কিউএস (QS) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে বুয়েনোস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয় (Universidad de Buenos Aires) আজ বিশ্বসেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ৮৪তম স্থানে সগৌরবে অবস্থান করছে। এর বাইরেও দেশটির একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক শীর্ষ তালিকায় সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল কিছু সংখ্যার গাণিতিক বিন্যাস নয়; এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি অকাট্য প্রমাণ যে, রাষ্ট্রটি চরম অর্থনৈতিক দোলাচলের মধ্যেও তার ‘জ্ঞান-উৎপাদনের কারখানা’ (Knowledge Production Houses) এবং বৌদ্ধিক চর্চাকে সচল ও স্বায়ত্তশাসিত রাখতে পেরেছে।
আর্জেন্টিনার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল ডিগ্রি বা সনদ বিতরণের কোনো যান্ত্রিক কারখানা নয়, বরং এগুলো হলো ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা সমালোচনামূলক বোধ, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং মননশীলতার আঁতুড়ঘর। এই উচ্চশিক্ষা কাঠামো রাষ্ট্রকে এমন এক সচেতন মধ্যবিত্ত ও সিভিল সোসাইটি উপহার দিয়েছে, যা যেকোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিকল্প ও টেকসই চিন্তার খোরাক জোগায়। সামষ্টিক অর্থনীতি যখন সাময়িকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে, তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সরবরাহ করা বৌদ্ধিক ভিত্তি সমাজকে সম্পূর্ণ নৈরাজ্যের অতলে তলিয়ে যেতে দেয় না। বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও সমাজতত্ত্বের এই নিরবচ্ছিন্ন ও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা দেশটির নীতি-কাঠামোকে একটি অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় দান করে।
মানবপুঁজি ও অপরাধ প্রতিরোধে শিক্ষার ভূমিকাঃ একজন অপরাধবিজ্ঞানী হিসেবে আমি মনে করি, মানসম্মত উচ্চশিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা সরাসরি অপরাধের গ্রাফ ও সামাজিক বিচ্যুতিকে (Social Deviance) নিয়ন্ত্রণ করে। যখন কোনো রাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার মান উন্নত ও সর্বজনীন থাকে, তখন সংকটের সময়েও যুবসমাজ কোনো চরমপন্থী মতাদর্শ বা সংঘবদ্ধ অপরাধের (Organized Crime) দিকে সহজে ধাবিত হয় না। আর্জেন্টিনা থেকে আমাদের সমকালীন বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষণীয় বিষয় এটাই—মানসম্মত শিক্ষা থেকে যে উচ্চমানের 'মানবপুঁজি' (Human Capital) তৈরি হয়, তা যেকোনো বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অভিঘাতের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষামূলক ঢাল হিসেবে কাজ করে।
দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশের দিকে তাকালে এই প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান-অবকাঠামোর তীব্র অভাব ও সংকট আমাদের গভীরভাবে পীড়িত করে। আমাদের অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) থাকা সত্ত্বেও, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা, গবেষণার খরা, জ্ঞানতাত্ত্বিক দৈন্যতা এবং বৈশ্বিক মানদণ্ডে ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে থাকার কারণে আমরা টেকসই সমৃদ্ধি অর্জনে হিমশিম খাচ্ছি। মানবপুঁজি যদি যথাযথ জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তিতে এবং নৈতিক মূল্যবোধে গড়ে না ওঠে, তবে তা শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সাংস্কৃতিক পুঁজি ও মনস্তাত্ত্বিক স্থিতিস্থাপকতাঃ আর্জেন্টিনার সমাজ-গঠনের পেছনে আরেকটি অনন্য ও শক্তিশালী উপাদান হলো তাদের ক্রীড়া সংস্কৃতি এবং অভিবাসনের ইতিহাস, যা তাদের জাতীয় আত্মপরিচয়কে সংকটের দিনে এক দুর্ভেদ্য দুর্গে রূপান্তর করেছে। ফুটবল সেখানে কেবল মাঠের কোনো বিনোদন বা খেলা নয়, বরং তা জাতীয় সংহতি ও সামষ্টিক মনস্তাত্ত্বিক আরোগ্য (Collective Psychological Healing)-এর এক অবিকল্প মাধ্যম। মারাদোনা থেকে মেসি পর্যন্ত প্রতীকী নায়করা সংকটের মুহূর্তে গোটা জাতির মনস্তত্ত্বে আশা ও আত্মবিশ্বাসের আলো প্রজ্বলন করেন। যখন নেতিবাচক অর্থনৈতিক খবর সমাজকে হতাশাগ্রস্ত করে তোলে, তখন ফুটবলের সবুজ মাঠে অর্জিত সাফল্য নাগরিকদের মনে করিয়ে দেয়—“আমরা এখনো ফুরিয়ে যাইনি।” এই সামষ্টিক আত্মবিশ্বাস অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতা রোধে এক মনস্তাত্ত্বিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
এই সমাজের পেছনে রয়েছে এক গভীর ও বৈচিত্র্যময় বহুসাংস্কৃতিক ইতিহাস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের, বিশেষ করে ইতালি থেকে আসা লাখ লাখ অভিবাসী তাদের শ্রমনিষ্ঠা, কারিগরি দক্ষতা এবং রন্ধনশৈলী নিয়ে মিশে গেছে আর্জেন্টিনার মূলধারায়। এই ইউরোপীয়-লাতিন সংমিশ্রণ দেশটির শিল্প-সাহিত্য, দর্শন ও রাজনৈতিক চেতনাকে এক অনন্য বহুমাত্রিকতা দিয়েছে। লিওনেল মেসির মতো বিশ্বসেরা ব্যক্তিত্বরা মূলত এই অভিবাসন, কঠোর অধ্যাবসায় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই ফসল।
সংকটের ছাইস্মৃতি থেকে পুনর্জাগরণের বার্তাঃ আর্জেন্টিনার এই জটিল দ্বৈত রূপ—একদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির সাময়িক অস্থিরতা, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা ও সংস্কৃতির সুগভীর ঐতিহ্য—আমাদের সামনে এক নতুন রাষ্ট্রদর্শন ও আশাবাদের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, কোনো জাতির প্রকৃত দেউলিয়াত্ব তার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোষাগারের শূন্যতায় ঘটে না, বরং তার মেধা ও মননের শূন্যতায় ঘটে। আর্জেন্টিনা আজ বিশ্বকে দেখাচ্ছে কীভাবে একটি দেশ তার অভ্যন্তরীণ জ্ঞান-কাঠামোর জোরে অর্থনৈতিক ঝড়ঝাপ্টাকে উপেক্ষা করে নিজস্ব সার্বভৌম অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদা টিকিয়ে রাখতে পারে। প্রতিটি সংকটই সেখানে ধ্বংসের শেষ রেখা নয়, বরং তা হয়ে উঠছে নতুন এক পুনর্জাগরণের (Renaissance) সূচনাবিন্দু।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ এবং গবেষকদের জন্য আর্জেন্টিনার এই জীবনসংগ্রাম এক যুগান্তকারী ও ইতিবাচক বার্তা বহন করে। আমাদের রয়েছে অফুরন্ত জনমিতিক লভ্যাংশ এবং অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্ম। এই বিশাল তরুণ সমাজকে যদি আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বিশ্বমানের জ্ঞান-অবকাঠামো, মৌলিক গবেষণা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার শক্তিতে দীক্ষিত করতে পারি, তবে যেকোনো বৈশ্বিক বা অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলা করা আমাদের জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র।
টেকসই সমৃদ্ধির এই অভিযাত্রায় আমাদের অতিসত্বর শিক্ষা খাতে কৌশলগত ও কাঠামোগত রূপান্তর ঘটাতে হবে এবং মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, ইতিহাসের অমোঘ সত্য এটাই—অর্থনৈতিক সূচক সাময়িকভাবে থমকে যেতে পারে, কিন্তু যে রাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানের মানবপুঁজি তৈরি করে এবং যে জাতির সংস্কৃতি অভেদ্য মনস্তাত্ত্বিক দুর্গ হিসেবে কাজ করে, পৃথিবীর কোনো সংকটের সাধ্য নেই তাকে চিরতরে থামিয়ে দেওয়ার। জ্ঞান ও সংস্কৃতির এই অক্ষয় আলোকেই বাংলাদেশ একদিন তার টেকসই সমৃদ্ধির চূড়ান্ত শিখর স্পর্শ করবে—আর্জেন্টিনা আখ্যান আজ আমাদের সেই অবিনাশী আত্মবিশ্বাসই জোগায়।
লেখক: প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক