রাসেল কবির:
বগুড়ার নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ নামে দুটি ইউনিয়নের নামকরণকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মহল নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নাম দুটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক, সামাজিক ও বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিন ধরেই বহুল ব্যবহৃত এবং স্বীকৃত। ফলে এ নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের সঙ্গে বাস্তবতা ও প্রশাসনিক নজিরের যথেষ্ট অমিল রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সচেতন নাগরিক ও সংশ্লিষ্টরা।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ‘সীমান্ত’ নামটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় নতুন কোনো শব্দ নয়। খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলা-এ ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’ নামে একটি ইউনিয়ন পরিষদ ১৯৯৭ সাল থেকে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অর্থাৎ প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে ‘সীমান্ত’ নাম ব্যবহারের দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় নজির বিদ্যমান।

শুধু প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই নয়, দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সরকার পরিচালিত একাধিক ‘সীমান্ত হাট’ও রয়েছে। কসবা সীমান্ত হাট, বালিয়ামারী সীমান্ত হাট, ডলুরা সীমান্ত হাট এবং ছাগলনাইয়া সীমান্ত হাট দেশের বৈধ সীমান্ত বাণিজ্যের স্বীকৃত অংশ। এসব সরকারি নামকরণ প্রমাণ করে যে ‘সীমান্ত’ শব্দটি জাতীয় পর্যায়ে বহুল ব্যবহৃত ও গ্রহণযোগ্য একটি নাম।
অন্যদিকে ‘দিগন্ত’ শব্দটি বাংলা ভাষায় অত্যন্ত পরিচিত, ইতিবাচক ও অর্থবহ একটি শব্দ। নতুন সম্ভাবনা, অগ্রযাত্রা এবং সুদূরপ্রসারী উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ও স্থাননামে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ‘দিগন্তপাড়া’ নামে একটি সুপরিচিত আবাসিক এলাকা রয়েছে। একই জেলার মাধবপুর উপজেলা-র ইটাখোলা-নোয়াপাড়া চা-বাগান এলাকায়ও ‘দিগন্তপাড়া’ নামে একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসতি পরিচিত।
এ ছাড়া নীল দিগন্ত দেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। সন্দ্বীপ উপজেলা-র উড়িরচর ইউনিয়নে ‘এএইচ দিগন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ এবং কুলাউড়া উপজেলা-র হাজিপুর এলাকায় ‘নবদিগন্ত’ নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও সরকারি নথিভুক্ত নাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি ‘দিগন্ত’ নামের টেলিভিশন চ্যানেল, রাজধানীর বিভিন্ন স্থাপনা ও পরিবহন সেবার নামও দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে।
দেশের সীমানা ছাড়িয়ে উপমহাদেশের অন্যান্য স্থানেও ‘দিগন্ত’ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ঝাড়গ্রাম জেলার নয়াগ্রাম এলাকায় ‘দিগন্ত মোড়’ নামে একটি পরিচিত স্থান রয়েছে। একইভাবে কলকাতা-র সল্টলেক ও নিউটাউন এলাকাতেও ‘নব দিগন্ত মোড়’ নামে সড়কসংযোগ ও স্থানীয় কেন্দ্র পরিচিতি লাভ করেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নতুন ইউনিয়নের নামকরণে ভৌগোলিক পরিচিতি, ভাষাগত সৌন্দর্য, ইতিবাচক অর্থ এবং স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে বিষয়টিকে ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে নামকরণের বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। তবে প্রশাসনিক নজির, সরকারি নামকরণ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের নামের ব্যাপক প্রচলন বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’—উভয় নামই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, অর্থবহ, গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবসম্মত। নতুন ইউনিয়নের নাম হিসেবে এ দুটি শব্দ ব্যবহারে ব্যতিক্রমী বা বিতর্কিত কিছু নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।