নিউজ ডেস্ক: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রবীণ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় ঐক্য সমর্থিত প্রার্থী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। মোট ৩৪৯টি ভোটের মধ্যে ভোট পড়েছে ৩৪৩টি।
২০ আগস্ট ভোটগ্রহণ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করেন। একই দিন নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করে।
মির্জা ফখরুলের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম একাধিক প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ফখরুল ২৫৫ ভোট পেয়ে ১৬৭ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।
নির্বাচিত হওয়ার পর ২১ আগস্ট শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক এবং সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি দেশের সাংবিধানিক প্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির পদ মূলত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক হলেও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে তাঁর সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে।
৭৮ বছর বয়সী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্রাবস্থায়। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় তাঁর জন্ম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়াশোনা করেন এবং ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন এবং বিভিন্ন সরকারি কলেজে অর্থনীতি পড়ান। পরবর্তীতে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন।
১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর দলটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে তিনি নির্বাচিত হন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে তাঁকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ তিনি বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ সময় তিনি দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে থেকে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী তাঁর দলীয় রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। ফলে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তাঁর দীর্ঘ অধ্যায়েরও আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪১ হাজার ১৭ ভোট।
দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতি, সংসদীয় দায়িত্ব ও মন্ত্রিত্বের পর দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর সামনে এখন দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জনগণের প্রতি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের চ্যালেঞ্জ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ড. মোহামেদ মুইজ্জুও তাঁকে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়ে এ নির্বাচনকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২২ আগস্ট সকালে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল তাঁকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা রক্ষা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
রাজনীতির মাঠে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ মির্জা ফখরুল এখন দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন—এটাই তাঁর নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।