দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু বাজেটের আকার বৃদ্ধি নয়, বরং ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে একটি বৈষম্যহীন ও প্রগতিশীল করব্যবস্থা প্রবর্তনই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার বলে মনে করে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট)।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে মুক্তিজোটের সংগঠন প্রধান আবু লায়েস মুন্না এবং সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজামাল আমিরুল ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তারা বলেন, কেবল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন মূল্যায়ন করা যায় না।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, “সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের বোঝা চাপিয়ে ধনী ও উচ্চবিত্তদের কর রেয়াত দেওয়ার নীতি অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তুলছে। ধনিক শ্রেণির আয়ের ওপর উচ্চহারে কর আরোপ এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের করের চাপ কমিয়ে একটি কার্যকর প্রগতিশীল করব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।”
এ প্রসঙ্গে তারা প্রাচীন রাষ্ট্রচিন্তাবিদ চাণক্যের করনীতির উল্লেখ করে বলেন, রাষ্ট্রের করনীতি এমন হওয়া উচিত, যেমন মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে-যেখানে সংগ্রহের পাশাপাশি ফুলের বিকাশ ও পরাগায়নও অব্যাহত থাকে। অর্থাৎ কর আদায় এমনভাবে হতে হবে যাতে জনগণের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
মুক্তিজোট মনে করে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর আরোপিত পরোক্ষ কর ও ভ্যাট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই এসব পণ্যের ওপর কর কমিয়ে সমাজের অতিধনী ও উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর করের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সঙ্গত করার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাতার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সহায়তার পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে।
মুক্তিজোটের নেতৃবৃন্দ বলেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি শিক্ষিত ও তরুণ বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি। এজন্য উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তাঁরা।
বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা ও বৈদেশিক উৎসের ওপর অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দলটি। নেতৃবৃন্দের মতে, অতিমাত্রায় ঋণনির্ভরতা সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এমনকি দেশের উৎপাদনশীল খাত, কৃষি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট সমাধানের বদলে সরকার ঋণনির্ভরতা, আমলাতান্ত্রিক অপচয় এবং কাগুজে প্রবৃদ্ধির ভেলকি দেখানোর পথেই হাঁটছে।
তারা প্রশ্ন রেখে বলেন, “রাষ্ট্রের আয়-সামর্থ্যের তুলনায় ব্যয়ের পরিধি ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং ঘাটতি পূরণে ঋণ ও করনির্ভরতার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আরও গভীর আলোচনা প্রয়োজন।” মুক্তিজোট দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণ, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া জনগণমুখী বাজেট সম্ভব নয়।
বিবৃতিতে মুক্তিজোট আশা প্রকাশ করে যে, সরকার সাধারণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বাজেটের প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংস্কার করবে।