মোঃ রাসেল কবির:
সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের ভর্তুকিনির্ভর ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে রাজধানীর বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় এই কার্যক্রমের আওতায় চাল ও আটা বিক্রির কেন্দ্রের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করছেন নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষজন।
ঢাকা রেশনিংয়ের আওতায় বর্তমানে রাজধানীতে প্রতিদিন ১১৮টি দোকান এবং ৭০টি ট্রাকের মাধ্যমে মোট ১৮৮টি পয়েন্টে ওএমএসের চাল ও আটা বিক্রি করা হচ্ছে। প্রায় দুই কোটি মানুষের এই মহানগরে এত সীমিতসংখ্যক বিক্রয়কেন্দ্র দিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের চাহিদা পূরণ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৭৫টি এবং উত্তর সিটিতে ৫৪টি—দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে মোট ওয়ার্ড রয়েছে ১২৯টি। এই হিসাব বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত দুটি করে ওএমএস বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হলেও মোট ২৫৮টি পয়েন্টের প্রয়োজন হবে। আর প্রতিটি ওয়ার্ডে তিনটি করে বিক্রয়কেন্দ্র চালু করা হলে এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৮৭টিতে।
মানবাধিকার সংগঠন, সমাজকর্মী ও সচেতন মহলের মতে, রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে জনসংখ্যা, নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস, বাজারদর এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে ওএমএস কার্যক্রমের বিক্রয়কেন্দ্র পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণে ঘনবসতিপূর্ণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি—এমন এলাকাগুলোতে বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা আরো বাড়ানো প্রয়োজন।
তাদের মতে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে দোকানভিত্তিক ওএমএস বিক্রয় কেন্দ্রের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়, জনবহুল এলাকা, শ্রমজীবী মানুষের আবাসস্থল এবং বস্তি-সংলগ্ন এলাকায় ট্রাকসেলের সংখ্যা বাড়ানো হলে নিম্ম আয়ের মানুষ সহজে সরকারি ভর্তুকির সুবিধা নিতে পারবেন। বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা মোকাবিলায় ঢাকা রেশনিংয়ের আওতায় প্রতিদিন অন্তত ৩০০টি বিক্রয় পয়েন্টে ওএমএস কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাবও দিয়েছেন বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের ব্যক্তিরা।
তাদের যুক্তি, বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়লে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ক্রেতাদের অতিরিক্ত ভিড় ও দীর্ঘ অপেক্ষার চাপ কমবে। পাশাপাশি দূরবর্তী এলাকা থেকে নিম্ন আয়ের মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি কমবে এবং সরকারের ভর্তুকির সুফল আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, কিছু ভুঁইফোড় ও হলুদ সাংবাদিক সরকারের এই জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার প্রচার করছে। ব্যক্তি স্বার্থে এই নিউজের মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগের আড়ালে পুরো কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছ সমাজ কর্মীরা। তাদের মতে, কোনো ডিলার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে।
কিন্তু বিচ্ছিন্ন অনিয়মের অভিযোগের কারণে দরিদ্র মানুষের জন্য চালু থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যসহায়তা কর্মসূচি যেন ব্যাহত না হয়, সেদিকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর রাখা জরুরি।
সরকারি ভর্তুকিতে চাল ও আটা পাওয়ার সুবিধাকে স্বাগত জানিয়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, শুধু নির্দিষ্ট কিছু স্থানে নয়, বরং প্রতিটি মহল্লা, জনবহুল এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড়ে দোকান ও ট্রাকের মাধ্যমে ওএমএস পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা হবে।
একই সঙ্গে বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
এদিকে ট্রাকসেলে পণ্য বিক্রির সময়সূচি নিয়েও ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি ট্রাকে দৈনিক দেড় টন চাল ও দুই টন আটা বিক্রির বরাদ্দ থাকে। ট্রাকসেলের সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও কোনো ট্রাকের পণ্য বিক্রি বিকেল ৩টা বা ৪টার মধ্যে শেষ হয়ে গেলেও ডিলারদের ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ডিলারদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অবস্থানের বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিক্রি ধীরগতিতে চলে, ফলে ক্রেতাদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাদের মতে, পণ্য বিক্রি শেষ হলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে আগেই ফেরার সুযোগ এবং দ্রুত বিতরণ নিশ্চিত করা হলে ডিলারদের অযথা অপেক্ষা ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি—দুটিই কমবে। পণ্য বিক্রি শেষ হওয়ার পরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখার বিষয়টিকে মানবিক ও শ্রমিক অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন হিসেবেও দেখছেন মানবাধিকার কর্মী ও সচেতন ব্যক্তিরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ওএমএস কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। রাজধানীর জনসংখ্যা, ওয়ার্ডভিত্তিক চাহিদা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসের ঘনত্ব বিবেচনায় নিয়ে নতুন বিক্রয়কেন্দ্র নির্ধারণ, দোকান সেল ও ট্রাক সেল বৃদ্ধি এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করা হলে এই কর্মসূচি আরও কার্যকর হতে পারে। এতে একদিকে যেমন নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যব্যয় কিছুটা কমবে, অন্যদিকে বাজারের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তাই জনস্বার্থে ঢাকা রেশনিংয়ের আওতায় ওএমএস কার্যক্রমের ব্যাপক সম্প্রসারণ, বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণে বিক্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সমাজসচেতন ব্যক্তিরা।