প্রফেসর ড. আসিফ মিজান:
"আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো নবনির্বাচিত সরকারপ্রধানের প্রাথমিক বৈদেশিক সফরের ক্রমবিন্যাস কেবল প্রথাগত সৌজন্যমূলক দ্বিপাক্ষিক সাক্ষাৎ নয়; বরং এটি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অগ্রাধিকার, কাঠামোগত বাধ্যবাধকতা এবং ভূ-রাজনৈতিক অভিমুখের (Geo-political Orientation) এক অকাট্য ইশতেহার।"
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রপরিচালনার গুরুদায়িত্ব গ্রহণের পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক পদক্ষেপসমূহ বিশ্বরাজনীতির বোদ্ধাদের গভীরভাবে আকর্ষণ করেছে। প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফরে কুয়ালালামপুর গমনের পর, তার ঠিক পরপরই দ্বিতীয় দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে ‘বেইজিং’ তথা চীনকে নির্বাচন করা বাংলাদেশের সমসাময়িক পররাষ্ট্রনীতিতে এক যুগান্তকারী ও কাঠামোগত পরিবর্তনের স্পষ্ট সিগন্যাল। ঐতিহাসিকভাবে ঢাকা যে প্রথাগত আঞ্চলিক ও একমুখী কূটনৈতিক বলয়ের (Monocentric Diplomatic Sphere) মনস্তাত্ত্বিক চাপে ছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় সফরেই বেইজিংকে বেছে নেওয়া বাংলাদেশের এক নতুন ‘স্বাধীন, সার্বভৌম ও স্বকীয়’ সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ। একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাঠক হিসেবে আমি এই রূপান্তরকে নিছক আকস্মিক ঘটনা মনে করি না; বরং এটি চার দশক আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে রোপিত সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনীতির কৌশলগত বীজের এক অবধারিত ও যৌক্তিক বিবর্তন।
ঐতিহ্যের ভিত্তিভূমি ও শক্তির ভারসাম্য (Balance of Power): শহীদ জিয়ার বাস্তবমুখী কূটনীতিঃ
চীনের সাথে বাংলাদেশের মৈত্রী সম্পর্কের শুভ সূচনা কোনো সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল বা ক্ষণস্থায়ী আবেগ ছিল না, বরং তা ছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অত্যন্ত প্রাজ্ঞ ও বাস্তবমুখী (Pragmatic Realism) কূটনীতির এক ঐতিহাসিক ফসল। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য আনয়ন এবং অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি চীনের সাথে সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত করেন। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে শহীদ জিয়ার সেই ঐতিহাসিক বেইজিং সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন ‘প্যারাডাইম শিফট’ (Paradigm Shift) ঘটায়।
শহীদ জিয়ার এই দূরদর্শী পদক্ষেপ ঢাকাকে একক আঞ্চলিক পরাশক্তির মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত হয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি চর্চার ঐতিহাসিক সুযোগ করে দেয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ‘শক্তির ভারসাম্য’ (Balance of Power) তত্ত্বের আলোকে তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, একটি উদীয়মান ও ক্ষুদ্রতর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার প্রধান হাতিয়ার হলো তার বাহ্যিক কূটনৈতিক বিকল্পের প্রসার। বেইজিং ছিল সেই সমীকরণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং কাঠামোগতভাবে ভারসাম্য রক্ষাকারী অংশীদার।
প্রাতিষ্ঠানিক সুসংহতকরণ: দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলঃ
পরবর্তীতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে এই সম্পর্ক কেবল অক্ষুণ্ণই থাকেনি, বরং তা কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক (Institutionalized) রূপ লাভ করে। ২০০২ সালে চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জু রংজি’র ঐতিহাসিক বাংলাদেশ সফর এবং বেগম খালেদা জিয়ার বেইজিং সফরের মধ্য দিয়ে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এক অভূতপূর্ব প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চতায় পৌঁছায়।
বেগম খালেদা জিয়ার সময়কালেই চীন বাংলাদেশের প্রধানতম প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী এবং অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে স্থায়ীভাবে আত্মপ্রকাশ করে। জিয়া পরিবারের এই সুসংহত কূটনৈতিক উত্তরাধিকার বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে দরকষাকষির ক্ষমতা (Bargaining Power) এনে দিয়েছিল, যা ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিকে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক জোটের লেজুড়বৃত্তি না করে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের শক্তি যোগায়।
‘নব্য-বাস্তববাদ’ এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy):
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘নব্য-বাস্তববাদ’ (Neo-realism)-এর অন্যতম প্রধান প্রবক্তা কেনেথ ওয়াল্টজের তত্ত্ব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা হলো একটি ‘অরাজক’ (Anarchic) ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্রকে তার নিজের নিরাপত্তা ও টিকে থাকার ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয় (Self-help System)। বর্তমান বিশ্বরাজনীতির তীব্র চড়াই-উতরাই ও নতুন শীতল যুদ্ধের (New Cold War) পটভূমিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে চীনকে বেছে নেওয়া একটি অত্যন্ত যৌক্তিক, সময়োপযোগী ও সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ তার নিজস্ব কাঠামোগত বাস্তবতাকে মাথায় রেখে কোনো একক পরাশক্তির আধিপত্য বা মনস্তাত্ত্বিক চাপ থেকে বেরিয়ে নিজের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy) অক্ষুণ্ণ রাখাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
মালয়েশিয়ার পর দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে চীনকে বেছে নেওয়া—এই ক্রমবিন্যাস প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন আর ভূ-রাজনৈতিকভাবে একমুখী বা দ্বিমুখী diplomatic দোটানায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক বৈচিত্র্যায়ন (Diplomatic Diversification) প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে ঢাকার অবস্থানকে আরও বেশি ‘যুক্তিযুক্ত’ (Rational) ও শক্তিশালী করে তোলে। তবে এই বিকল্পের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, শর্তনিষ্ঠ ও জাতীয় স্বার্থের অনমনীয় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে।
'লুক ইস্ট পলিসি'র আনুষ্ঠানিক রূপান্তর ও ভূ-অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতাঃ
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই দ্বিতীয় দ্বিপাক্ষিক সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ‘লুক ইস্ট পলিসি’ বা পূর্বমুখী কূটনীতি নিছক ধারণার গণ্ডি থেকে বের হয়ে একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূ-অর্থনৈতিক রূপ ধারণ করেছে। দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশের কূটনীতি ও অর্থনীতি প্রধানত পশ্চিমা বাজারের ওপর তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং নির্দিষ্ট কিছু রেমিট্যান্স-কেন্দ্রিক অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু যখন আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (Asia-Pacific Era) স্থানান্তরিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য বেইজিং-কেন্দ্রিক পূর্বমুখী নীতি আর কোনো ঐচ্ছিক বিকল্প নয়, বরং একটি ভূ-অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা (Geo-economic Imperative)।
চীন আজ কেবল বৈশ্বিক ম্যানুফ্যাকচারিং হাব নয়, বরং আধুনিক সরবরাহ শৃঙ্খলের (Supply Chain) অন্যতম নিয়ন্ত্রক। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI), পোর্ট আধুনিকায়ন, রেল ও লজিস্টিক করিডোর—এসবের মাধ্যমে যে ভূ-অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তা যদি প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা যায়, তবেই বাংলাদেশ তার স্বাধীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে।
স্বর্ণযুগের রূপরেখা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমলে প্রত্যাশা ও কৌশলগত রোডম্যাপঃ
শহীদ জিয়ার দর্শন ও বেগম খালেদা জিয়ার ধারাবাহিকতাকে ধারণ করে বর্তমান বিশ্বের বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মাঝেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এক অভূতপূর্ব ‘স্বর্ণযুগে’ পদার্পণ করতে যাচ্ছে। এই স্বর্ণযুগ বিনির্মাণের মূল স্তম্ভগুলো হবে নিম্নরূপ:
প্রযুক্তি স্থানান্তর ও স্থানীয় মূল্য সংযোজন:
সকল চীনা বিনিয়োগে উচ্চ প্রযুক্তির রূপান্তর এবং জ্ঞান বিনিময় (Knowledge Transfer) বাধ্যতামূলক করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনের প্রযুক্তি স্থানান্তর বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
ঋণশর্তে স্বচ্ছতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা:
দ্বিপাক্ষিক সকল অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত চুক্তিতে সর্বোচ্চ আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, যাতে জনগণের সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ সর্বদা সুরক্ষিত থাকে এবং কোনো প্রকার ঋণজটের (Debt-trap) ঝুঁকি তৈরি না হয়।
অংশীদারিত্বের বৈচিত্র্যায়ন ও ভারসাম্য:
চীন-কেন্দ্রিক প্রকল্পগুলোর সমান্তরালে জাপান, ইউরোপীয় উন্নয়ন সংস্থা এবং বহুমাত্রিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় রক্ষা করা, যাতে একক কোনো শক্তির ওপর অতি-নির্ভরতা তৈরি না হয়।
একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ:
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় দ্বিপাক্ষিক ‘চেয়ার’ স্থাপন, শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস্টার এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন মিশনের মাধ্যমে এই সহযোগিতাকে টেকসই এবং জনমুখী রূপ দেওয়া।
উপসংহারে বলা যায়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বীজ রোপণ করেছিলেন এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন; আজ একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তিত ও জটিল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত ও সার্বভৌম শিখরে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই বেইজিং সফর স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, বাংলাদেশ এখন আর ভূ-রাজনীতির দাবার ঘুঁটি (Pawn) নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক স্বনির্ভর, দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ খেলোয়াড় (Rational Actor)।
জিয়ার দর্শন, খালেদা জিয়ার ধারাবাহিকতা এবং তারেক রহমানের আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক দূরদর্শিতার সমন্বয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আগামী দিনে এক নজিরবিহীন কৌশলগত স্বর্ণযুগে পদার্পণ করবে—যেখানে বাংলাদেশ অন্যের ছায়ায় নয়, বরং নিজস্ব সার্বভৌম শক্তিতে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
লেখকঃ প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক ও উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া।