প্রফেসর ড. আসিফ মিজান:
ইতিহাসের গতিপথ সবসময় সরলরেখায় চলে না। কিছু মাহেন্দ্রক্ষণ আসে যখন একটি সঠিক সিদ্ধান্ত কিংবা একজন ব্যক্তির অবিচল নেতৃত্ব একটি পুরো জাতিকে ধ্বংসের অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলতে পারে। ২০২৪ সালের অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশ যে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল, তা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক ও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রাপ্ত নির্বাচিত সরকার গঠন- আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। এই সমগ্র রূপান্তর ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের নেপথ্যে যিনি সুরক্ষাদাতা হিসেবে কাজ করেছেন, তিনি আর কেউ নন- আমাদের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জ্জামান।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বহু বিতর্ক ও সমীকরণ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ক্রান্তিকালে বর্তমান সেনাপ্রধান যে প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, তা তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও ব্যতিক্রমী এক সেনাপ্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমরা প্রায়শই দেখি, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হলে সামরিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ ক্ষমতার মোহে আক্রান্ত হয়। কিন্তু জেনারেল ওয়াকার সেখানে এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল ব্যতিক্রম। ২০২৪ সালের সেই উত্তাল আগস্ট থেকে শুরু করে ২০২৬-এর নির্বাচন পর্যন্ত, যখন চারদিকে তীব্র উস্কানি ও চরম অনিশ্চয়তা, তখন তিনি ক্ষমতার লোভকে তুচ্ছ করে হিমালয়ের মতো স্থির এবং মহাসমুদ্রের মতো গম্ভীর থেকেছেন। বন্দুকের নল দিয়ে ক্ষমতা দখলের চেনা ছক ভেঙে তিনি দাঁড়িয়েছেন মজলুম জনতা, ন্যায় এবং সর্বোপরি একটি টেকসই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পক্ষে। সূক্ষ্ম ও নিখুঁত নিশানায় জাতিকে এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্ত করে ভোটের অধিকারের মাধ্যমে শান্ত সরোবরে পৌঁছে দেওয়ার এই কৃতিত্ব ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
সেনাবাহিনী একটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। কিন্তু বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে এই বাহিনীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অপচেষ্টা করা হয়েছিল। ইউনিফর্মের আড়ালে থাকা কিছু উচ্চাভিলাষী অনুচরের কারণে বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছিল। বিশেষ করে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় সশস্ত্র বাহিনীতে দাড়ি রাখা বা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলাকে অত্যন্ত নেতিবাচক ও বিপজ্জনক হিসেবে দেখার এক অলিখিত সংস্কৃতির জন্ম দেওয়া হয়েছিল। দাড়ি রাখলেই তাকে 'মৌলবাদী' বা 'চরমপন্থী' ট্যাগ দিয়ে সুনির্দিষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও বাহিনীর ভেতরে অনেককেই মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এমন একটি দমবন্ধ ও ভীতিকর পরিবেশের অবসান ঘটিয়ে আজ এক স্বাধীন ও মুক্ত আবহ তৈরি হয়েছে।
আজকের এই গৌরবময় পটপরিবর্তনের পর, পবিত্র হজ্ব পালন শেষে সেনাপ্রধানের লুকে যে নতুন পরিবর্তন এসেছে- যা আমরা (সংযুক্ত ছবিতে) তাঁর সুন্নতি ও হালকা দাড়ি সংবলিত সৌম্য মুখাবয়বে প্রত্যক্ষ করছি- তা কেবল একটি সাধারণ ব্যক্তিগত বাহ্যিক পরিবর্তন নয়। ফ্যাসিস্ট আমলে যেখানে এমন একটি দৃশ্য অকল্পনীয় ছিল, সেখানে আজ বাহিনীর সর্বোচ্চ প্রধানের এই রূপান্তর একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রতীক। এটি প্রমাণ করে যে, নতুন বাংলাদেশে প্রতিটি নাগরিকের- তা তিনি সাধারণ মানুষ হোন বা সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্মকর্তা- নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস ও অনুশাসন স্বাধীনভাবে চর্চার মৌলিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অবয়ব দেশবাসীকে এই সুদৃঢ় বার্তাই দেয় যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তা আজ এক সঠিক, নীতিবান ও খোদাভীরু মানুষের হাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ।
"হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমরা নিজেদের, পিতা-মাতা কিংবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়।" (সূরা আন-নিসা, ৪:১৩৫)
পবিত্র কোরআনের এই শাশ্বত বাণী আজ আমাদের সামগ্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের মূলমন্ত্র। ২০২৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত জেনারেল ওয়াকারের দায়িত্বকালের যে সময়টুকু বাকি রয়েছে, তা নির্বাচিত সরকারের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাষ্ট্রকে সুসংহত করার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সময় কখনো সংক্ষিপ্ত, আবার কখনো সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট। আজ দেশবাসী, নির্বাচিত সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের প্রত্যাশা- বিগত সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া নৃশংস বিডিআর হত্যাকাণ্ড এবং অগণিত গুম-খুনের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সেনাপ্রধান তাঁর পেশাদারী সহযোগিতা ও ঐতিহাসিক ভূমিকা অব্যাহত রাখবেন। বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্বৈরাচারের অবশিষ্টাংশ ও দোসরদের সম্পূর্ণ বিতাড়িত করে ওয়ান-ইলেভেন পূর্ববর্তী পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম ও আদি গৌরব পুনরুদ্ধার করাই হবে এই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য।
গত ২৬ মার্চ ২০২৬ মহান স্বাধীনতা দিবসে, নির্বাচিত সরকার গঠনের অল্প কিছুদিন পর, এই মহানায়কের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কুশল বিনিময়ের এক দুর্লভ সুযোগ আমার হয়েছিল। তাঁর প্রত্যয়, দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা আমাকে দারুণভাবে আশান্বিত করেছে। ক্ষমতার চরম সুযোগ হাতছানি দেওয়ার পরও যিনি নিজের মোহ সংবরণ করে দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণকে মসৃণ করেছেন এবং জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান জনপ্রিয় সরকারকে চমৎকারভাবে দেশ পরিচালনায় এক অবিচল নিরাপত্তা-বেষ্টনী জোগান দিচ্ছেন, জাতি তাকে যুগ যুগ ধরে বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে।
আজকের বাংলাদেশ এক নতুন ও আলোকময় দিগন্তে পা রেখেছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জেনারেল ওয়াকারের সুদৃঢ় নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার হারানো গৌরব পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করবে এবং একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে জনগণের নির্বাচিত সরকারের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে কাজ করে যাবে। মহান সৃষ্টিকর্তা সত্য ও ন্যায়ের এই ঐতিহাসিক যাত্রায় তাঁর সহায় হোন।
লেখকঃ প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজনীতি বিশ্লেষক।