গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ভিত্তিগুলোর একটির পর একটি ভেঙে পড়ছে। রাজনৈতিক খামখেয়ালিপনা, ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রতিহিংসা ও দায়িত্বহীন আচরণ গণতন্ত্রকে ক্রমেই সংকুচিত করে তুলছে।
বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু ন্যূনতম পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সংলাপের পরিবেশ আজ প্রায় অনুপস্থিত। সরকারে থাকা পক্ষ বিরোধী কণ্ঠকে অবমূল্যায়ন করছে, আবার বিরোধীরা সরকারের বিরুদ্ধে অযাচিত আক্রমণাত্মক অবস্থান নিচ্ছে। এর ফলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন হয়ে উঠছে বিশৃঙ্খল ও বিভাজিত।
জাতিসংঘ অধিবেশনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে বিভক্তি, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও হতাশা তৈরি করছে।
এদিকে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। একদিকে সরকার বলছে, আমলাতন্ত্র দায়িত্বশীল নয়; অন্যদিকে বিরোধীরা অভিযোগ করছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণে ব্যবহৃত হচ্ছে। একইসাথে কিছু বিরোধী দল ও নাগরিক আন্দোলনের ঘোষিত কর্মসূচি কখনো কখনো জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলছে। এতে জনগণের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দলীয় স্বার্থে সংবিধান সংশোধন, প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণকরণ এবং নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভূমিকা সব মিলিয়ে জনগণের আস্থা ভয়াবহভাবে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে ভোটারবিহীন কেন্দ্র, বিরোধী প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল ও আগাম ব্যালট পূরণের অভিযোগ সাধারণ মানুষকে গণতন্ত্রের অর্থ নিয়েই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে বারবার স্বৈরাচারের আঘাত এসেছে, রাজনৈতিক দল ও সংবাদপত্র নিষিদ্ধ হয়েছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করা হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের পথে গেছে। তার মতে, বর্তমান সরকার দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী আমির ড. শফিকুর রহমান ‘প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন’ (PR) পদ্ধতিতে নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছেন, আর দলের সিনিয়র নেতা গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘জুলাই সনদ’ আইনি রূপ দেওয়ার পথে রাজনৈতিক বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
এমন অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিবেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার, এমনকি সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার সবই এখন উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সৈরাচারমুক্ত সুবিদাবাদ বিরোধী এক্সপ্রেস নামের কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সাংবাদিকদের হয়রানি ও অপমানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাংবাদিকদের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতা পেশাগত নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা দুটোকেই হুমকিতে ফেলছে।
বিভিন্ন পুরোনো আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বিপন্ন করে তুলছে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—গণতন্ত্র কি কেবল নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা হবে একটি জীবন্ত সংস্কৃতি, যেখানে নাগরিকের মতামত, অধিকার ও অংশগ্রহণের পূর্ণ সম্মান থাকবে?
বাংলাদেশের মানুষ চায় এমন একটি গণতন্ত্র, যেখানে তারা ভয় ছাড়াই কথা বলতে পারবে, স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে, আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থাকবে দলনিরপেক্ষ। রাজনৈতিক মতের পার্থক্য থাকলেও, সংলাপ ও সহনশীলতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন সময়ের দাবি।
এক অপরকে শত্রু নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা এই চর্চাই গণতন্ত্রের প্রথম পাঠ। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান, প্রতিষ্ঠান ও জনগণের অধিকার রক্ষায় একযোগে কাজ করলেই টিকে থাকবে গণতন্ত্র। নচেৎ, গণতন্ত্রের নামে আরও এক প্রহসনের ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
লেখক ও গবেষক: আওরঙ্গজেব কামাল।
সভাপতি, ঢাকা প্রেস ক্লাব