আওয়ামীলীগ আমলে ব্যাংক খাতে লুটপাট: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক তিন গভর্নরের বিরুদ্ধে তদন্ত

আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শিথিলতা ও নীতিগত সহায়তার কারণে ব্যাংক দখল, ঋণ জালিয়াতি, রিজার্ভ চুরি থেকে শুরু করে ছাপানো টাকার অপব্যবহার পর্যন্ত ঘটেছে। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে তিন সাবেক গভর্নর—ড. আতিউর রহমান, ফজলে কবির ও আবদুর রউফ তালুকদারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)। তদন্তের আওতায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী এবং বিএফআইইউ-এর সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাসও।
তদন্তে মূল গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ঋণ জালিয়াতি, ব্যাংক লুট, ব্যাংক দখল, রিজার্ভ চুরি ও ছাপানো টাকার ব্যবহার নিয়ে। রাজনৈতিক বিবেচনায় খেলাপি ঋণ পুনর্গঠন, বিশেষ ছাড় দিয়ে ঋণ নবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শিথিল নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব নীতিমালা ক্ষমতাসীনদের প্রভাবেই তৈরি করা হয়েছিল।
বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ২০১৬ সালের রিজার্ভ চুরির ঘটনা। তদন্তকারীরা তথ্যপ্রযুক্তির ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কারা এর পেছনে ছিল বা সুবিধাভোগী হয়েছে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
২০২০ সালে করোনার সময় এবং ২০২২ সালে বৈশ্বিক মন্দার শুরুর পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা ছাপানো হয়। এর একটি অংশ বাজারে ছাড়ার পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকগুলোকেও তারল্য জোগানে দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, এসব ছাপানো টাকার বড় একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে। সাবেক গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের আমলে নিয়মকানুন না মেনে টাকা বাজারে ছাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যায়।
তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও অ্যাননটেক্স গ্রুপের জালিয়াতির ঘটনাও। বিশেষ করে বেসিক ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের ঋণ জালিয়াতির পরও সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ খুঁজে দেখা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাংক দখলের সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকসহ একে একে ১০ ব্যাংক এবং একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করে নেয় এস আলম গ্রুপ। এসব ব্যাংক থেকে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে এখন প্রয়োজন ৪ লাখ কোটি টাকা।
সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ইতোমধ্যে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেছে। সেই ভিত্তিতে দুদক, সিআইডি ও বিএফআইইউ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে। তদন্ত শেষে সাবেক তিন গভর্নর ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের মুখোমুখি করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

