গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতিতে ধস: সময় বাকি এক মাস, কাজ বাকি ৪২%, ব্যয় বাড়ার শঙ্কা, জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পে সময়ক্ষেপণ ও ধীরগতির কাজ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ৫৬১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ প্রকল্পের কাজটি ডিসেম্বর ২০২৫-এ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ১১ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৫৮ শতাংশ। ফলে সময়সীমা শেষ হতে মাত্র এক মাস বাকি থাকলেও অর্ধেকেরও বেশি কাজ অসম্পূর্ণ।
প্রকল্প পরিচালক মনীষ চাকমা স্বাক্ষরিত চিঠিতে এসব তথ্য জানা যায়। প্রকল্পের সময়সূচি অনুযায়ী এখন পর্যন্ত পুরো কাঠামোর অধিকাংশ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে কাজের গতি শুরু থেকেই ছিল শ্লথ। ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপূর্ত বিভাগকে মোট ৪৭২ কোটি ৯১ লাখ ৭৫ হাজার টাকার প্রাক্কলিত বরাদ্দ দেওয়া হলেও তারা আবাসিক ভবনে ব্যয় করেছে মাত্র ৬ কোটি টাকা এবং অনাবাসিক ভবনে ১৯৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এই ধীর অগ্রগতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নে উঠে—গণপূর্ত বিভাগের তদারকি, সক্ষমতা ও কাজের পরিকল্পনায় কি বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে?
প্রকল্পের ব্যয় খাতেও দেখা গেছে নানা বৈষম্য; প্রকল্পে এ পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে ২৩০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যার মধ্যে মটোরযান, কম্পিউটার, আসবাবপত্র ও অফিস সরঞ্জাম কেনায় ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ ৬১ হাজার টাকা, বইপত্র ও সাময়িকী বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকা – যা প্রকল্পের বর্তমান ভৌত অগ্রগতির তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ৪ বারে তিনজন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন; ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনে কাজের ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। এর ফলে পরিকল্পনা, তদারকি ও কাজের গতি সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়েছে, আর এর দায় অবশ্যই বহন করতে হবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে। বিশেষ করে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক মনীষা চাকমা এর আগেও প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল কাজের গতি বাড়ানো, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চাপ দেওয়া, কাজের অগ্রগতি নিশ্চিত করা—কিন্তু প্রকল্পের শেষ মাসে এসে মাত্র ৫৮ শতাংশ কাজ নিঃসন্দেহে তাঁর তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করে।
প্রকল্পের এই ধীরগতির কারণে সময় ও ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনাও খুব বেশি। সময় বাড়লে জনবল, যন্ত্রপাতি, নির্মাণ সামগ্রী, ওভারহেড ব্যয়সহ প্রতিটি খাতেই ব্যয় বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক মনিষ চাকমা বলেন, আমরা সময় ও ব্যয় বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়, তাহলে কমপক্ষে ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের ঘাড়ে গিয়ে পড়বে। কিন্তু এই সময়ক্ষেপণ ও ব্যয় বৃদ্ধির দায় কে নিবে? এ জন্য কোনো তদন্ত হবে কি? দুদক বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এর কারণ অনুসন্ধান করবে কি?
শুরু থেকে কাজের গতি জটিলতা, পরিকল্পনার অসংগতি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতা, গণপূর্ত বিভাগের ধীর তদারকি এবং প্রকল্প পরিচালনার অদক্ষতা – সব মিলিয়ে এ প্রকল্প এখন সময়সীমার শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণের এই প্রকল্প সময়মতো শেষ হবে কি না, ব্যয় আরও কত বাড়বে, কিংবা জবাবদিহির আওতায় কারা আসবে – এখন জনমনে সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।