বাংলাদেশের কূটনীতিতে বড় বদল: ভারতের সাথে দূরত্ব বাড়িয়ে, চীনের দিকে ঝুঁকছে ঢাকা


বিশেষ প্রতিবেদন:
ক্ষমতার পট বদলের পর গত এক বছরে বাংলাদেশের কূটনীতিতে বড় ধরনের সরে-আসা লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘদিনের ভারতকেন্দ্রিক কৌশল অপেক্ষাকৃত হ্রাস পেয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নানা দিক থেকে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে—অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সীমান্তগত সম্পর্ক জটিলায় পতিত হয়েছে।
গত ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে কঠিন হতে শুরু করে। ভারতীয় গণমাধ্যম–সামাজিক মাধ্যমে কিছু সময় সংখ্যালঘু ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ঘটে যাওয়া হামলা–অত্যাচার সম্পর্কিত অপতথ্য সংবাদ ছড়ানোর ঘটনা এবং দিল্লি থেকে রাজনৈতিক মন্তব্য করার মতো পরিস্থিতি উভয়পক্ষের মধ্যে আস্থা ঝাঁকুনি দেয়। সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির বলেছেন, “পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে যখন বিচার চলছে, তখন দিল্লিতে বসে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যও দিতে দেখা গেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো জটিল করে তুলেছে।”
অর্থনৈতিক সম্পর্কেও দৃশ্যমান অবনতি। গত এক বছরে দুই দেশের মধ্যে একাধিক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ভিসা নিষ্ক্রিয়তা বাড়ার ফলে পাল্টা প্রভাব প্রকাশ পায়—বিশেষত পর্যটন, চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য ভারতে যাওয়া বাংলাদেশিদের প্রবাহ দারুন ভাবে কমে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগের মতো বছরে প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি ভারতে যাওয়া এখন এক স্বপ্নসদৃশ; ভিসা অনুমোদনের হার লেখচিত্র অনুযায়ী প্রায় ৮০ শতাংশ বা তারও বেশি কমে গিয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। এছাড়া সীমান্তে পুশব্যাকের ঘটনা এবং ডিসেম্বরে আগরতলায় বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশন কার্যালয়ে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনার ফলে কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ে।
এই ফাঁকটি ভরাট করতে দ্রুতই চীন নিজেকে সক্রিয়ভাবে উপস্থাপন করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরেই অধ্যাপক ইউনূস বেইজিং সফরে যান; সেখানে বিনিয়োগ, নদী ব্যবস্থাপনা ও রোহিঙ্গা সমস্যাসহ একাধিক ইস্যুতে আলোচনা হয় এবং কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। চীনের পক্ষ থেকে মোংলা বন্দর উন্নয়নসহ বড় প্রকল্পে আগ্রহ প্রকাশ এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে কুনমিংয়ের কয়েকটি হাসপাতালকে বাংলাদেশিদের জন্য নির্দিষ্ট করা—এসবই সম্পর্কের ঘনত্ব বাড়ার লক্ষণ। এ ছাড়া চীন একাধিক রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের নিজ দেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্পর্ক সম্প্রসারণে মনোযোগ দিয়েছে; এর মধ্য দিয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও বাম সংগঠনের নেতাদের চীন সফর নেয়ার খবরও পাওয়া গেছে, যা বিশ্লেষকদের মতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের সাথেও সীমাহীন শীতলতা পরবর্তী সময়ে কিছুটা গলতে দেখা গেছে। গত এপ্রিলে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক এবং ২৮ জুলাই নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক ফোরামে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ তাপমাত্রা বেড়েছে—একইসঙ্গে ১৯৭১ সংক্রান্ত পুরানো অমীমাংসিত ইস্যুগুলো আলোচ্য হয়েছে। যদিও বিশ্লেষকরা পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সম্পর্ক জোরদারের কিছু প্রচেষ্টা ‘অলংকারিক’ হিসেবে মূল্যায়ন করছেন, বাণিজ্যিক/অর্থনৈতিক অঙ্কে ভবিষ্যতে সাদৃশ্য হতে পারে বলে আশাবাদও ব্যক্ত করছেন কূটনীতিকরা।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কদর ও কৌশলগত অবস্থানও পর্যালোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। গত বছরের জুলাই–আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের তদন্ত ও প্রতিবেদনকে কিছু বিশ্লেষক অধ্যাপক ইউনূস সরকারের কূটনৈতিক সফলতা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওয়াকব্যাক ও শক্তিশালী প্রতিশোধমূলক শুল্কনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহুমুখীভাবে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তাও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে—কেননা বিশ্ব বাণিজ্যে শুল্ক ও বাজারে চঞ্চলতা দ্রুত উদ্বেগ জাগায়।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, একফসলি বা একদেশ নির্ভর পররাষ্ট্রনীতি ছেড়ে বহুমুখী কূটনীতি গ্রহণ অবশ্যই সুবিধাজনক; তবে সেটি কেবল রাগ বা তাত্ক্ষণিক রাজনৈতিক সুযোগের রাজনীতি হলে দেশীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অধ্যাপক এনাম খান বলেছেন, “চীনের কাছে অতীতেও বাংলাদেশের গুরুত্ব ছিল, বর্তমানে তা বজায় আছে—তবে ভারসাম্য রাখা জরুরি।” তিনি আরও যুক্ত করেছেন, কূটনীতিতে স্বার্থ নির্ধারণে বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও মানুষের অধিকার—এই সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাতে জাতীয় স্বার্থে ক্ষতি না ঘটে।
সরকারি কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো শুধুমাত্র নীতির নয়—ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, অর্থনৈতিক চাপ এবং অঞ্চলের শক্তি বিন্যাসের পরিবর্তনও এতে ভূমিকা রাখছে। যে কোনো ক্ষেত্রে, পরবর্তী পদক্ষেপগুলো কিভাবে গ্রহণ করা হবে ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান কিরকম হবে—এটি ভবিষ্যত অধ্যায় নির্ধারণ করবে।