দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নতুন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রস্তুতি ও প্রচারণা। রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রামাঞ্চল—সর্বত্রই ভোটের উৎসবের আবহ। তবে এই সময়ে সহিংসতা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নির্বাচন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা সেই উদ্বেগকে তীব্র করেছে। শনিবারের এই হামলার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হত্যাচেষ্টার সঙ্গে জড়িতদের ধরিয়ে দিতে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যে হামলাকারী হিসেবে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদের নাম উঠে আসে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
হামলার পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা। তাদের দাবি, নির্বাচন বানচাল করতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট মহলের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এ ধরনের সহিংসতা ঘটছে। শরীফ ওসমান হাদি নিজেও জানিয়েছেন, এর আগে ভারতীয় নম্বর থেকে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি-বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও একই ধরনের হুমকির কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অঙ্গনে ঐক্যের আহ্বান জোরালো হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, হামলাটি পূর্বপরিকল্পিত এবং এর পেছনে বড় নেটওয়ার্ক কাজ করছে, যার উদ্দেশ্য নির্বাচন ভণ্ডুল করা। নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচন ঠেকাতে ষড়যন্ত্র চলছে এবং জনগণই রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রকৃত নিরাপত্তা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতির স্বার্থে দলীয় বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকা ছাড়া বিকল্প নেই। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও একই সুরে বিভাজনমূলক বক্তব্য পরিহারের আহ্বান জানান।
হামলার প্রতিবাদে সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেলা-উপজেলা শহর—সবখানেই অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছে। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম ও পাবনায় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতা ও পারস্পরিক দোষারোপ বাড়লে লাভবান হবে ক্ষমতাচ্যুত শক্তি। তাই জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা পুনরুজ্জীবিত করাই এখন সময়ের দাবি। দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ রক্ষায় রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও জনগণের সম্মিলিত সজাগ ভূমিকার ওপরই নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচনের সাফল্য।