চাঁদাবাজি ও মামলা বাণিজ্যের অপকর্ম ধামাচাপায় ব্যস্ত দীঘিনালা উপজেলা বিএনপি নেতা জয়নাল (পর্ব-২)

প্রকাশিত: 11:39 am, October 11, 2025 | আপডেট: 11:39 am,

চাঁদাবাজি ও মামলা বাণিজ্যের অপকর্ম ধামাচাপায় ব্যস্ত দীঘিনালা উপজেলা বিএনপি নেতা জয়নাল (পর্ব-২)

নিজস্ব প্রতিনিধি: প্রকাশের তারিখ : ৯ অক্টোবর ২০২৫: খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীনের চাঁদাবাজি ও মামলা বাণিজ্যে অতিষ্ঠ সাধারণ জনগণ— এমন শিরোনামে গত ৬ অক্টোবর নিউজ টিভি অনলাইন পত্রিকায় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

 

ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য ও প্রমাণনির্ভর ওই প্রতিবেদনের পর থেকে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন নিজের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ ধামাচাপা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, জয়নাল আবেদীন তার ঘনিষ্ঠ ও মাসিক মাসোহারা প্রাপ্ত কিছু কথিত গণমাধ্যমকর্মীকে নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন এবং প্রতিবেদনটির প্রভাব মোকাবিলায় নানা ফন্দি-ফিকিরে লিপ্ত রয়েছেন।

 

অন্যদিকে প্রতিবেদনের প্রকাশের পর নিউজ টিভির প্রতিনিধি ও সম্পাদককে একাধিক ব্যক্তি ফোনে এবং সরাসরি যোগাযোগ করে সংবাদটি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলার জন্য নানাবিধ অনৈতিক প্রস্তাব দেন। সাংবাদিক সমাজ মনে করছে, এমন প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ—সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও নৈতিকতার পরিপন্থী।

 

চাঁদাবাজি ও মামলা বাণিজ্যে অতিষ্ঠ দীঘিনালাবাসী স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও—যে নির্দেশনায় তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মামলা বাণিজ্য থেকে বিরত থাকতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন—সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে জয়নাল আবেদীন নিজের প্রভাব বিস্তারে নানা অপকর্মে লিপ্ত হন।

 

তথ্যসূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে সরকারের পতনের পর থেকে জয়নাল আবেদীন দীঘিনালা অঞ্চলে এক আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন। তিনি অভিযোগ অনুযায়ী, নিজ নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসী বাহিনীর মাধ্যমে স্থানীয়দের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল ও মামলা বাণিজ্য পরিচালনা করছেন।

 

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জয়নাল আবেদীন কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ট্রাকপ্রতি এক লক্ষ টাকা করে চাঁদা আদায় করেন। প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫টি কাঠবোঝাই ট্রাক দীঘিনালার ওপর দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে মাসে কোটি টাকার বেশি চাঁদা তার হাতে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কাঠ বোঝাই কয়েকটি ট্রাক গায়েব হয়ে গেছে, যেগুলোর বাজারমূল্য ছিল নয় থেকে দশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত।

 

অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ :৫ আগস্টের পর থেকে জয়নাল আবেদীনের নির্দেশে কয়েকজন নিরীহ ব্যক্তিকে অপহরণ করে নির্যাতনের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দুই লক্ষ টাকার মুক্তিপণ আদায় করা হয় তার উপস্থিতিতেই।

 

দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে: দীঘিনালা উপজেলা বিএনপির কয়েকজন পদধারী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জয়নালের এসব অপকর্মে আমরা বিব্রত। আমাদের দলীয় ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তারেক রহমান বারবার বলেছেন—ব্যক্তিগত অনিয়মের দায় দল নেবে না। জয়নালের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আমরা কেন্দ্রীয় নেতা ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে অবহিত করেছি।”

 

ভয়ে মুখ খুলছে না স্থানীয় সাংবাদিকরা: দীঘিনালা উপজেলার কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক জানিয়েছেন, তারা জয়নালের চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মামলা বাণিজ্য নিয়ে প্রতিবেদন করতে পারছেন না শুধুমাত্র সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায়। তারা জানান, “ঢাকা থেকে সাংবাদিকরা এসে যেভাবে অনুসন্ধান করেছেন ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য নিয়েছেন—সেই তথ্য শতভাগ সত্য।”

 

একজন স্থানীয় সাংবাদিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জয়নাল আবেদীনের মতো নেতাদের কারণেই দীঘিনালা উপজেলা বিএনপির জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে। এতে খাগড়াছড়ির বর্ষীয়ান নেতা ওয়াদুদ ভূঁইয়ার ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

 

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান: স্থানীয় বিএনপি ও ভুক্তভোগীরা দলীয় নীতি-নির্ধারকদের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন—দলীয় ভাবমূর্তি রক্ষা এবং দীঘিনালার সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

 

উল্লেখ্য, চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে কিছুদিন আগে সেনাবাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন জয়নাল আবেদীন। পরে মোছলেখা দিয়ে মুক্তি পান বলে এলাকাবাসী জানান।

 

প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে জয়নাল আবেদীনের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।



একটি মন্তব্য করুন

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *