স্থবিরতা কাটছে না অর্থনীতিতে, পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা

প্রকাশিত: 10:55 am, December 14, 2025 | আপডেট: 10:55 am,

স্থবিরতা কাটছে না অর্থনীতিতে, পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা
স্থবিরতা কাটছে না অর্থনীতিতে, পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে থাকলেও দেশের অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও ব্যবসা-বিনিয়োগ, ভোগব্যয় ও বাজারে চাঙাভাব—কোনোটিই দৃশ্যমান নয়। ফুটপাত থেকে বড় শপিংমল, হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা পর্যটন এলাকা—সবখানেই ক্রেতা ও ভিড় কম। শিল্পোউদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখনো ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’-এর অবস্থানে রয়েছেন।

শেয়ারবাজারে সূচক নেমে এসেছে তলানিতে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে গত এক বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া বহু শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা যায়নি। ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়াতেও অগ্রগতি ধীর। রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, তবে ডলারের দাম কমেনি। মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে।

বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছে। গত মঙ্গলবার ১৩টি ব্যাংক থেকে মোট ২০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কেনা হয়েছে। মাল্টিপল প্রাইস নিলামে প্রতি ডলারের কাট-অফ রেট ছিল ১২২ টাকা ২৯ পয়সা। অন্যদিকে বাজেট বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত গতি নেই। রাজস্ব আদায়ে কিছু প্রবৃদ্ধি থাকলেও গত বছরের তুলনায় আদায়ের পরিমাণ কমেছে।

রপ্তানি খাতেও টানা চতুর্থ মাসের মতো পতন অব্যাহত। নভেম্বরে রপ্তানি আয় ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কিছুটা চাঙাভাব আসতে পারে। নির্বাচনি প্রচারণা ও প্রার্থীদের চলাচলে গ্রামাঞ্চলে অর্থের সরবরাহ বাড়বে—এমন আশা করছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

তবে শহরাঞ্চলে এর প্রতিফলন এখনো স্পষ্ট নয়। রাজধানীর নিউ মার্কেট, গুলিস্তান ও চকবাজার ঘুরে দেখা গেছে, নির্বাচনি মৌসুম হলেও ক্রেতা উপস্থিতি আশানুরূপ নয়। প্রচারসামগ্রী, পোশাক, সাউন্ড সিস্টেম ও পরিবহন খাতে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়নি। নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘আগে নির্বাচন এলেই বিক্রি বাড়ত। এবার দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতা নেই।’

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও তারল্যসংকট বড় উদ্বেগ হয়ে রয়েছে। গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে খেলাপি ঋণ। কয়েকটি ব্যাংকে সুদের হার বেড়েছে, ফলে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে ঋণপ্রবাহ কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। নতুন বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই স্থবির। যদিও অবৈধ পথে রেমিট্যান্স আসা কমে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাহ বেড়েছে।

রিটেইল চেইন ব্র্যান্ডের মালিক জাহিদ আহমেদ টিটু বলেন, ‘মানুষের হাতে টাকা নেই। কাজের পরিধি কমেছে। তাই নির্বাচন সামনে থাকলেও স্বাভাবিক ঋণপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে না।’ অধিকাংশ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান কোনোমতে টিকিয়ে রাখছেন এবং নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিস্থিতির উন্নতির আশায় আছেন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো চাপের মুখে এবং নির্বাচনের আগে এ চাপ বাড়তে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের পথে রয়েছে—বিদেশ ভ্রমণ ও গাড়ি কেনায় বিধিনিষেধ বহাল আছে। ফেব্রুয়ারির আগেই বাজেট সংশোধনের কাজ শুরু করেছে অর্থবিভাগ। পাশাপাশি নতুন পে-কমিশন দ্রুতগতিতে কাজ করছে।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমার আভাস দেওয়া হলেও বাংলাদেশের বাজারে তার সুফল এখনো মিলছে না। ভরা মৌসুমেও শাকসবজি, মাছ-মাংসের দাম চড়া; বেড়েছে জ্বালানি ও ভোজ্য তেলের দাম। আয় না বাড়ায় এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে। সব মিলিয়ে নির্বাচনের মাত্র দুই মাস বাকি থাকলেও অর্থনীতিতে এখনো স্থবিরতার ছাপ স্পষ্ট।



একটি মন্তব্য করুন

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *