সংশোধিত এডিপিতে বড় প্রকল্পে বড় কাটছাঁট, শীর্ষ ১০ প্রকল্প থেকে কমছে ১২ হাজার কোটি টাকা

প্রতিবারের মতো চলতি অর্থবছরেও বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ ১০টি প্রকল্প থেকে মোট ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে এই তালিকায় ব্যতিক্রম হিসেবে রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, যেখানে কোনো বরাদ্দ কমানো হচ্ছে না। বরং ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে বাড়তি বরাদ্দ দিয়ে কাজ দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আগামীকাল সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় সংশোধিত এডিপি অনুমোদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বছরের শুরুতে বড় প্রকল্পগুলোতে উচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে পুরো অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয় না। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। এসব কারণেই সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ কমানো হচ্ছে।
সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ কমানো হচ্ছে মেট্রোরেল প্রকল্পে।
-
এমআরটি-১ (বিমানবন্দর–মতিঝিল ও পূর্বাচল–নতুনবাজার) প্রকল্পে মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে তা কমিয়ে ৮০১ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ ৭ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা বা প্রায় ৯১ শতাংশ বরাদ্দ কমানো হচ্ছে।
-
এমআরটি-৬ (মতিঝিল–কমলাপুর সম্প্রসারণ) প্রকল্পে বরাদ্দ ১ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা করা হচ্ছে।
-
এমআরটি-৫ (উত্তরাংশ) প্রকল্পে বরাদ্দ ১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা থেকে কমে দাঁড়াচ্ছে ৫৯২ কোটি টাকায়।
-
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ ৪ হাজার ৮৬ কোটি টাকা থেকে ৭৩ শতাংশ কমিয়ে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
-
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে ৭৩৩ কোটি টাকা কমিয়ে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩০৬ কোটি টাকা।
-
বিমানবন্দর–গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পে বরাদ্দ ২৫৬ কোটি টাকা কমিয়ে ১৬৮ কোটি টাকা করা হচ্ছে।
-
সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল–রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নয়ন প্রকল্পে ৩১০ কোটি টাকা কমিয়ে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা।
-
ঢাকা–সিলেট চার লেন সড়ক প্রকল্পে বরাদ্দ কমছে ৫৫ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে থাকছে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা।
দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ কমানো হয়নি। সংশোধিত এডিপিতেও ১০ হাজার ১১ কোটি টাকা বরাদ্দ বহাল থাকছে।
অন্যদিকে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। মূল এডিপির সঙ্গে অতিরিক্ত ১ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা যোগ করে সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পটির বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে ৪ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের জন্য মূল এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে তা কমিয়ে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা কমছে।
স্থানীয় উৎস থেকে অর্থায়ন ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। আর প্রকল্প সহায়তা হিসেবে বরাদ্দ ৮৬ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে দাঁড়াচ্ছে ৭২ হাজার কোটি টাকায়। বর্তমানে এডিপিতে মোট ১ হাজার ১৭১টি প্রকল্প রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট করা হয়েছিল—৪৯ হাজার কোটি টাকা। তখন সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের শ্লথগতি এডিপি কাটছাঁটের অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি বলেন, “প্রকল্পের দেরির কারণে ব্যয় বাড়ে, অথচ শুরুতে যে অর্থনৈতিক সুফলের হিসাব করা হয়, তা আর বাস্তবসম্মত থাকে না।”
তিনি আরও বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, তদারকি ও জবাবদিহির ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই দুর্বলতা কাটিয়ে না উঠলে একই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে।