সাংস্কৃতিক ও নাট্যব্যক্তিত্ব প্রয়াত অধ্যাপক বাণীতোষ চক্রবর্তী (বাণী স্যার)-এর জন্মবার্ষিকী

প্রকাশিত: 2:13 pm, July 3, 2026 | আপডেট: 2:13 pm,

সাংস্কৃতিক ও নাট্যব্যক্তিত্ব প্রয়াত অধ্যাপক বাণীতোষ চক্রবর্তী (বাণী স্যার)-এর জন্মবার্ষিকী

নিজস্ব প্রতিবেদক :

গ্লোবাল নিউজ বিডি ২৪. কম পত্রিকা’র টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী’র পিতা প্রয়াত অধ্যাপক বাণীতোষ চক্রবর্তী (বাণী স্যার)- এর জন্মবার্ষিকী।

অধ্যাপক বাণীতোষ চক্রবর্তী বাণী স্যার ছিলেন গোপালপুর ও উত্তর টাঙ্গাইলের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া জগতে এক অবিসংবাদিত নাম। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অনন্য দৃষ্টান্ত। শুধু কলেজের ক্লাসরুমে নয়, তিনি সারাজীবন ছাত্রদের প্রতি ছিলেন গুরুর মতো দায়িত্বশীল ও স্নেহময়। ছাত্রদের মননশীলতা, বুদ্ধিমত্তা, নৈতিকতা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও ব্যক্তিত্বের বিকাশে যে নিষ্ঠা, পরিশ্রম এবং সময় তিনি ব্যয় করেছেন, তা আজও অনুকরণীয়।

প্রয়াত অধ্যাপক বাণীতোষ চক্রবর্তী (বাণী স্যার ) শিক্ষাকে কেবল পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেন না। তিনি শিক্ষাকে জীবনমুখী করেছিলেন। তার শিক্ষাদানের ধরন ছিল বোধগম্য, সহানুভূতিশীল এবং অনুপ্রেরণামূলক। ছাত্রদের শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে শেখাতেন না, বরং তাদের জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং দায়িত্বশীল করে গড়ে তুলতেও তিনি সমানভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা তাকে শুধু শিক্ষক বা অধ্যাপক হিসেবে নয়, বরং একজন পরামর্শদাতা, বন্ধু এবং জীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবেও পাশে পেয়েছেন ।

শিক্ষা ও জ্ঞানের পাশাপাশি বাণীতোষ চক্রবর্তী বাণী স্যারের সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত ও ক্রীড়ার প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ ও প্রেম। তিনি সংস্কৃতি চর্চায় ছিলেন এক বটবৃক্ষের মতো অভিভাবক।নতুন প্রজন্মের কাছে বিভিন্ন দিকের পথপ্রদর্শক হিসেবে তাঁর ভূমিকাও ছিল প্রশংসনীয়। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং উদার মনোভাব শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে অম্লান ছাপ রেখেছে। তিনি প্রায়শই বলতেন যে শিক্ষার মূল লক্ষ্য শুধু জ্ঞান অর্জন নয়, বরং মানবিক গুণাবলী ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ।

বাণী স্যার ছিলেন একজন বহুমাত্রিক সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, গর্বিত ও সম্মানিত অভিবাবক, সমাজসেবক এবং সংস্কৃতিচর্চায় আলতকবর্তিকা ও পথপ্রদর্শক।

তার শিক্ষাজীবন ছিল এক দীর্ঘ এবং সফল যাত্রা। তিনি টাঙ্গাইল জেলার শিক্ষা ক্ষেত্রে যে অবদান রেখেছেন, তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কলেজের শিক্ষক হিসেবে তার জীবন শুধুমাত্র পাঠদান ও পরীক্ষা পর্যালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি শিক্ষার্থীদের জীবনের প্রতিটি সমস্যায় দিকনির্দেশনা দিতেন, তাদের মনের খেয়াল রাখতেন এবং যে কোনো সমস্যা ও সংকটে সমাধান খুঁজে দিতেন। তার এমন দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষাদান পদ্ধতি স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থায় এক আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছিল।

বাণী স্যারের মানবিকতা ও উদার মনোভাব শুধুমাত্র শিক্ষার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সমাজসেবায়ও ছিলেন অগ্রণী। গোপালপুর ও উত্তর টাঙ্গাইলের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নয়নে তিনি যে ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি স্থানীয় স্কুল, কলেজ এবং সাংস্কৃতিক সংস্থায় সদা সক্রিয় ছিলেন। তিনি নিয়মিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতেন, নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করতেন এবং স্থানীয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতেন।

তার ব্যক্তিত্বে মিলিত ছিল জ্ঞান, মানবতা, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনের অমিত শক্তি। যে কোনো সমস্যায় তিনি দৃষ্টান্তস্বরূপ সমাধান দিতেন। শিক্ষার্থীরা শুধু তার পাঠ্যপুস্তকীয় জ্ঞানই নয়, বরং জীবনের মূলনীতি, মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং উদার মনোভাবও তার কাছ থেকে শিখেছে। বাণী স্যার কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত, যা সমাজের প্রতিটি স্তরে অনুপ্রেরণা জোগায়।
১৯৪৪ সালের ১ জুলাই তিনি টাঙ্গাইল জেলার কালীহাতি উপজেলার পাইকরা ইউনিয়নের রোয়াইল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন।
ছোট বেলা থেকেই সবাই প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁর সম্ভাবনীয় সকল দ্যুতি।
তিনি গ্রামের স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা, গোপালদিঘি হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা, টাঙ্গাইলের সাদত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিতে মাষ্টার্স ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানকালিন সময় তিনি সেখানে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট যে কোনো কার্যক্রমে সক্রিয় থেকে যথাযথ ভূমিকা রেখে এসেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন।
মাষ্টার্স পাশ করার পর জীবনের প্রথম চাকরির পরীক্ষাতেই তিনি ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর কলেজের প্রতিষ্ঠাকালিন সময়ের সর্বপ্রথম নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলার অধ্যাপক হিসেবে টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার গোপালপুর কলেজে যোগদান করেন।
তিনি ১৯৭০ সালে টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার ডুবাইল গ্রামের সূতী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাট্যব্যক্তিত্ব রামজীবন ঘটকের মেয়ে মঞ্জু রাণী দেবীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
সেখান থেকেই তিনি তার স্ত্রী ও তিন পুত্র সন্তান নিয়ে এই ডুবাইল গ্রামের বাসিন্দা হয়ে গোপালপুরবাসী হিসেবে এখানেই থেকে যান। এখানে থেকে তিনি এখানকার সকল প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। গোপালপুর কলেজে অধ্যাপনাকালিন সময়েই অধ্যাপক বাণীতোষ চক্রবর্তী রাজনৈতিক
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ঘনিষ্ঠ বন্ধু শাজাহান সিরাজের একান্ত অনুরোধে ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ছোটবেলা থেকেই সে নিজেকে মানুষ গড়ার কারিগর অর্থাৎ শিক্ষকতা পেশাকেই সে জীবনের ব্রত হিসেবে হৃদয়ে ধারন করেছেন। তাঁর হাজার হাজার ছাত্র আজ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। তাঁর অনেক ছাত্র আজ শিক্ষক, অধ্যাপক, সচিব, বিচারপতি, এসপি, ইউএনও, ব্যারিষ্টার, ডিসি, এডভোকেট, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার,সাংবাদিক,বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক
ব্যক্তিত্বসহ অন্যান্য শ্রেণিপেশায় সুনামের সঙ্গে দায়িত্বপালন করে আসছেন। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলেও তিনি এই শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যান নি।
থেকে যান টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলায়।জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল শ্রেণিপেশার মানুষের সাথে তার ঐকান্তিক ব্যবহার তাঁকে অনন্য উচ্চতায় বসিয়েছে।
আর এজন্যই টাঙ্গাইলের গোপালপুরের মানুষ, গোপালপুরের সাংস্কৃতিক কর্ম-পরিবেশ ও প্রকৃতির মায়ায় সে আবধ্য থেকে তার যাপিত জীবন অতিবাহিত করেছেন। তিনি বার্ধক্যজনীত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর গোপালপুরের ডুবাইল গ্রামের নিজবাড়িতে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।
এলাকার সকলের কাছে অধ্যাপক বাণীতোষ চক্রবর্তী ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন। এলাকার সকল মানুষ প্রয়াত অধ্যাপক বাণীতোষ চক্রবর্তীকে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। গ্লোবাল নিউজ বিডি ২৪. কম-এর পরিবার সাংবাদিক বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর প্রয়াত পিতা অধ্যাপক বাণীতোষ চক্রবর্তীর স্মরণে তার আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা করেছেন।



একটি মন্তব্য করুন

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *