সরকারি আবাসনে নতুন দৃষ্টান্ত: মিরপুর পাইকপাড়ায় আধুনিক বহুতল আবাসন প্রকল্পে নান্দনিকতা, প্রকৌশল দক্ষতা ও সেবার অনন্য সমন্বয়

প্রকাশিত: 9:48 am, July 7, 2026 | আপডেট: 9:48 am,

মিরপুর পাইকপাড়ায় ১,২০০ ফ্ল্যাটের আধুনিক বহুতল আবাসন প্রকল্পে নান্দনিকতা, প্রকৌশল দক্ষতা ও সেবার অনন্য সমন্বয়
সরকারি আবাসনে নতুন দৃষ্টান্ত: মিরপুর পাইকপাড়ায় আধুনিক বহুতল আবাসন প্রকল্পে নান্দনিকতা, প্রকৌশল দক্ষতা ও সেবার অনন্য সমন্বয়

মোঃ রাসেল কবিরঃ

রাজধানীর মিরপুরের পাইকপাড়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত বহুতল আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পটি দেশের সরকারি আবাসন ব্যবস্থাপনায় এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আধুনিক স্থাপত্যশৈলী, সুপরিকল্পিত অবকাঠামো, উন্নত নাগরিক সুবিধা এবং দৃষ্টিনন্দন পরিবেশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পটি সরকারি আবাসন খাতে একটি আদর্শ ও অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হিসেবে ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে।

প্রায় ১৮.৩৬ একর জমির ওপর নির্মিত হয়েছে ১৩ তলা বিশিষ্ট ২৫টি আধুনিক আবাসিক ভবন। এসব ভবনে মোট ১,২০০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি ভবনে ৮০০ বর্গফুট আয়তনের ৮১৬টি এবং ৮টি ভবনে ১,০০০ বর্গফুট আয়তনের ৩৮৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে। ১,০০০ বর্গফুটের ৮টি ভবনের নিচতলায় প্রতিটিতে ২২টি করে মোট ১৭৬টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা আধুনিক নগরজীবনের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৮ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা। তবে দক্ষ পরিকল্পনা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাত্র ৯৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা হয়েছে, যা সরকারি অর্থের সাশ্রয়ী, দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্টদের সততার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রকল্পেটির কাজ শুরু হয়ে ২০২৫ সালে ডিসেম্বরে শেষ হয়।

প্রকল্পটির স্থাপত্য নকশা, ভবনের বিন্যাস এবং সামগ্রিক পরিকল্পনা সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রতিটি ভবনের অবস্থান, খোলা জায়গা, সবুজ পরিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রতি যে সূক্ষ্ম মনোযোগ দেওয়া হয়েছে, তা প্রকৌশলীদের সৃজনশীলতা ও পেশাগত দক্ষতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। আধুনিক ডিজাইন, টেকসই নির্মাণশৈলী এবং ব্যবহারবান্ধব পরিকল্পনা এই আবাসন প্রকল্পকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় সরকারি আবাসিক কমপ্লেক্সে পরিণত করেছে।

প্রকল্পের অভ্যন্তরে ধর্মীয় সম্প্রীতির চমৎকার প্রতিফলনও লক্ষ্য করা যায়। এখানে নির্মিত হয়েছে দুটি মসজিদ—একটি ছয়তলা এবং অপরটি চারতলা বিশিষ্ট আধুনিক শৈল্পিক মসজিদ। পাশাপাশি বাংলাদেশের কোনো আবাসিক প্রকল্পে প্রথমবারের মতো তিনতলা বিশিষ্ট আধুনিক একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনার এক অনন্য উদাহরণ।

বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য স্থাপন করা হয়েছে চারটি গভীর নলকূপ এবং প্রতিটি ভবনের নিচে ১ লাখ গ্যালন ধারণক্ষমতার আন্ডারগ্রাউন্ড পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা।  পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য স্থাপন করা হয়েছে তিনটি এসটিপি (STP) প্ল্যান্ট। পুরো প্রকল্প এলাকাজুড়ে নির্মিত হয়েছে প্রায় ১৩,১২৪ ফুট দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন সীমানা প্রাচীর।

প্রতিটি আবাসিক ভবনে রয়েছে দুটি করে ১,০০০ কেজি ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ইউরোপীয় মানের লিফট। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্থাপন করা হয়েছে ২৫০/৩০০/৩১৫ কেভিএ বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২৫টি ভবনের প্রতিটি ভবনেই রয়েছে ৬০ কেভিএ জেনারেটর ও ২৫ কিলোওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, এ ছাড়াও রয়েছে এয়ারকুলার, সাউন্ড সিস্টেম, নেটওয়ারিং সিস্টেম, পিবিএক্স (PBX) সুবিধা, সিসিটিভি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সর্বাধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং উন্নতমানের এলইডি লাইটের আলোয় আলোকিত অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক অবকাঠামোসহ অন্যান্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত আনছার দ্বারা নিরাপত্তার ব্যবস্থা।

প্রকল্পে রয়েছে ছয়তলা ফাউন্ডেশন ও চারতলা বিশিষ্ট ২টি সার্ভিস ভবন, ৬,০০০ বর্গফুটের ১টি মাল্টিপারপাস ভবন, তিনতলা বিশিষ্ট ১টি দৃষ্টিনন্দন ফ্লোটিং ক্লাব হাউস, তিনতলা বিশিষ্ট প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং একটি আধুনিক কমিউনিটি ভবন। সবুজ ও পরিবেশবান্ধব আবাসন নিশ্চিত করতে প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৭৯ হাজার দেশি-বিদেশি ফলজ, বনজ ও ফুলের চারা রোপণ করা হয়েছে। ফলে পুরো আবাসন এলাকাটি এক মনোরম, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব আবহ সৃষ্টি করেছে, যা বাসিন্দাদের জন্য নির্মল ও আরামদায়ক জীবনযাপনের সুযোগ এনে দেবে।

সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী, নকশা প্রণয়নকারী প্রকৌশলী, স্থপতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা তাঁদের দক্ষতা, সততা, পরিকল্পনা এবং নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি যুগোপযোগী ও নান্দনিক সরকারি আবাসন নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আধুনিক প্রকৌশল জ্ঞান, উন্নত নির্মাণ প্রযুক্তি এবং নান্দনিক স্থাপত্যের সমন্বয়ে তাঁরা এমন একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন, যা ভবিষ্যতের সরকারি আবাসন নির্মাণে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সামগ্রিকভাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত এই বহুতল আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পটি শুধু একটি আবাসন প্রকল্প নয়; এটি আধুনিক নগর পরিকল্পনা, উন্নত প্রকৌশল, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং সর্বোচ্চ নাগরিক সুবিধার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসন নগরী। দেশের সরকারি আবাসন খাতে এটি দীর্ঘদিন একটি অনুকরণীয় ও গর্বের প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।



একটি মন্তব্য করুন

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *