দ্বিতীয় বিপ্লব বনাম বহুত্ববাদের অবসান: চতুর্থ সংশোধনীর দ্বান্দ্বিক বাস্তবতা

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান:
একটি রাষ্ট্রের সংবিধান কেবলই কিছু শুষ্ক আইনি দলিলের সমষ্টি নয়, বরং তা নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সামাজিক চুক্তির (Social Contract) এক জীবন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর কর্তৃক মাত্র ১১ মিনিটে পাস হওয়া চতুর্থ সংশোধনী কেবল এই চুক্তির রূপান্তর ঘটায়নি, বরং তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সাংবিধানিক একনায়কত্ব’ (Constitutional Authoritarianism) এবং সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘বহুত্ববাদী সংস্কৃতির অবলোপন’ ঘটিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সংকট মোচনের নামে গৃহীত এই সংশোধনীটি কেন আজ অর্ধশতক পরেও আন্তর্জাতিক politics ও মানবাধিকারের পরিমণ্ডলে গভীর বিতর্ক ও সমালোচনার খোরাক জোগায়, তা সমাজ, রাজনীতি ও অপরাধতাত্ত্বিক তত্ত্বের আলোকে ব্যবচ্ছেদ করা প্রয়োজন।
কাঠামোগত রূপান্তর: ৪র্থ সংশোধনীর ব্যবচ্ছেদ
এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ২৫টি অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করা হয় এবং বেশ কিছু নজিরবিহীন ধারা যুক্ত করা হয়, যা বাংলাদেশের মৌলিক শাসনতান্ত্রিক কাঠামোকে আমূল বদলে দেয়:
পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার: ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন ব্যবস্থা चालू করা হয়। রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী করে সকল ক্ষমতা তাঁর হাতে ন্যস্ত করা হয়।
একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো: বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করে সংবিধানে ‘ষষ্ঠ-ক’ ভাগ যুক্ত করার মাধ্যমে কেবল একটি মাত্র জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠনের বিধান রাখা হয়। এই ক্ষমতার বলে পরবর্তীতে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) গঠিত হয় এবং অন্য সব দল নিষিদ্ধ হয়।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব: ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে অধস্তন বা নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত ছিল। ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির অধীনে আইন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির একক হাতে চলে যায়।
মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা লোপ: নাগরিকদের মৌলিক অধিকার বলবৎ বা রক্ষা করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট (অনুচ্ছেদ ১০২) করার যে সাংবিধানিক এখতিয়ার ছিল, তা বাতিল করা হয়।
দুর্বল আইনসভা ও নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম: জাতীয় সংসদকে একটি সর্বময় ক্ষমতাহীন সংস্থায় রূপান্তর করা হয় এবং রাষ্ট্রপতি যেকোনো সময় সংসদ ভেঙে দেওয়ার একক ক্ষমতা লাভ করেন। এর ধারাবাহিকতায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাত্র ৪টি সংবাদপত্র (দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার ও বাংলাদেশ টাইমস) চালু রেখে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়।
প্রবক্তাদের যুক্তি: ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-এর পটভূমি
চতুর্থ সংশোধনীকে তৎকালীন সরকার এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি আইনি ও শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন মাত্র মনে করেননি, বরং একে অভিহিত করেছিলেন “দ্বিতীয় বিপ্লব” হিসেবে। তত্ত্ব ও বাস্তবতার নিরিখে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে যে যুক্তিগুলো উপস্থাপন করা হয়েছিল:
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা: স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে চরম বিশৃঙ্খলা, পাটের গুদামে আগুন, চোরাচালান এবং বিভিন্ন উগ্র-বামপন্থী দলের সশস্ত্র তৎপরতা ও নাশকতা দমনে একটি কঠোর, কেন্দ্রীভূত ও গতিশীল ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল।
অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাস ও চরম অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের একমুখী রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে জরুরি মনে করা হয়েছিল।
দুর্নীতি ও কালোবাজারি প্রতিরোধ: প্রশাসনিক জটিলতা ও ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের দীর্ঘসূত্রতা দূর করে সরাসরি রাষ্ট্রপতির নির্দেশনায় দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা ও কালোবাজারিদের দমন করার উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সমালোচকদের দৃষ্টিতে: বহুত্ববাদের অবসান ও ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা
বিপরীতপক্ষে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমালোচকদের মতে এই সংশোধনী ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ‘সাংবিধানিক বিচ্যুতি’ বা ‘গণতন্ত্রের কফিন’। এই পক্ষের মূল আপত্তিগুলো ছিল:
বহুত্ববাদ বনাম রাষ্ট্রীয় এককেন্দ্রিকতা: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল (Robert Dahl) তাঁর বহুত্ববাদ (Pluralism) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার একাধিক কেন্দ্র এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর উপস্থিতি অপরিহার্য। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে যখন সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একক জাতীয় দল গঠন করা হলো, তখন তা ডালের ‘পলিআর্কি’ (Polyarchy) ধারণাকে সমূলে বিনাশ করে। লুই আলথুসার (Louis Althusser) বর্ণিত ‘রাষ্ট্রীয় আদর্শিক যন্ত্রপাতি’ (Ideological State Apparatuses) হিসেবে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করতে মাত্র চারটি সংবাদপত্র রেখে বাকি সব বন্ধ করা তারই প্রমাণ।
ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ: ফরাসি দার্শনিক মন্টেস্কু ক্ষমতার পৃথকীকরণ (Separation of Powers) নীতিতে স্পষ্ট করেছেন যে—শাসন, আইন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ না থাকলে নাগরিক স্বাধীনতা বিপন্ন হতে বাধ্য। চতুর্থ সংশোধনী বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের একটি বর্ধিত অংশে (An extension of the executive) পরিণত করে। লন ফুলারের (Lon Fuller) ‘আইনের নৈতিকতা’ (Morality of Law) ক্ষুণ্ণ করে এখানে আইনের শাসন (Rule of Law) রূপান্তরিত হয় ‘আইন দ্বারা শাসনে’ (Rule by Law)।
মানবাধিকারের অপরাধতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি: অপরাধতত্ত্বের ‘রাষ্ট্রীয় অপরাধ’ (State Crime) এবং ‘ভিকটিমোলজি’ (Victimology) তত্ত্বের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, অনুচ্ছেদ ১০২-এর অধীনে হাইকোর্ট বিভাগের রিট এখতিয়ার বাতিল করা ছিল নাগরিকের আইনি সুরক্ষাকবচ কেড়ে নেওয়ার শামিল। টমাস হবসের ‘লেভিয়াথান’ (Leviathan) ধারণার মতো রাষ্ট্র এখানে সর্বশক্তিমান হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক শাসন ও বিচারবহির্ভূত ক্ষমতা চর্চার পথকে সুগম করেছিল।
আইনি পুনর্মূল্যায়ন ও সমকালীন বাস্তবতা
ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, উপায়ের মাধ্যমে লক্ষ্যের পবিত্রতা (Purity of means to achieve ends) প্রমাণ করতে এই সংশোধনী ব্যর্থ হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ে (যেমন- ৫ম ও ১৬শ সংশোধনীর মামলার পর্যবেক্ষণে) চতুর্থ সংশোধনীকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করেছে। এমনকি ২০২৪ সালের শেষের দিকে এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হলে, আদালত এটি কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে, যা এর বিতর্কিত আইনি ভিত্তিকে পুনর্বার সামনে নিয়ে আসে।
অতএব, চতুর্থ সংশোধনী কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জন্য একটি অন্যতম বৃহৎ ‘কেস স্টাডি’। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন নির্ভর করে তার প্রাতিষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তির (Inclusive Institutions) ওপর, যা ড্যারন আডেমোগ্লু এবং জেমস রবিনসন তাঁদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Why Nations Fail’-এ দেখিয়েছেন। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে যে এক্সট্রাক্টিভ বা বর্জনমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার সূচনা হয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।
শাসনতান্ত্রিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এই সংশোধনী আনা হয়েছিল বলে প্রবক্তারা দাবি করলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের বহুত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল বলেই সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়। একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক এবং মানবাধিকার-বান্ধব বাংলাদেশ বিনির্মাণে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ ও ‘বহুত্ববাদের অবসান’-এর এই দ্বান্দ্বিক শিক্ষা আজীবন প্রাসঙ্গিক থাকবে।
লেখকঃ – প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া); সমাজ, রাজনীতি, অপরাধ ও মানবাধিকার বিশ্লেষক।