ব্রহ্মপুত্রের বুকে বন্দর ও সোনারগাঁও: অপার সৌন্দর্য, ইতিহাস ও বাস্তবতার মিশেল

প্রকাশিত: 6:10 pm, August 9, 2025 | আপডেট: 6:10 pm,

ব্রহ্মপুত্রের বুকে বন্দর ও সোনারগাঁও: অপার সৌন্দর্য, ইতিহাস ও বাস্তবতার মিশেল

মো. মাহবুবুর রহমান (নোমান-আল-কাদেরী):

ব্রহ্মপুত্র নদ এশিয়া মহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। সংস্কৃত ভাষায় ব্রহ্মপুত্রের অর্থ “ব্রহ্মার পুত্র”। এজন্য একে “ব্রহ্মপুত্র নদ” বলা হয়। ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব নাম ছিল লৌহিত্য।
ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি হিমালয় পর্বতমালার কৈলাস শৃঙ্গের নিকট জিমা ইয়ংজং হিমবাহে, যা তিব্বতের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। জাঙপো নামে তিব্বতে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে এটি ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে যখন এর নাম হয়ে যায় শিয়াং বা সিয়ং। তারপর আসামের উপর দিয়ে দিহাং নামে বয়ে যাবার সময় এতে দিবং এবং লোহিত নামে আরো দুটি বড় নদী যোগ দেয় এবং তখন সমতলে এসে চওড়া হয়ে এর নাম হয় ব্রহ্মপুত্র। ব্রহ্মপুত্র হিমালয় পর্বতের কৈলাস শৃঙ্গের নিকটে মানস সরোবর থেকে উৎপন্ন হয়ে তিব্বত ও আসামের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের কাছে ব্রহ্মপুত্র দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে জামালপুর ও ময়মনসিংহ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরববাজারের দক্ষিণে মেঘনায় পড়েছে।
১৭৮৭ সালে ভূমিকম্পের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদ এর তলদেশ‌ উত্থিত হ‌ওয়ার কারণে এর দিক পরিবর্তিত হয়ে যায়। ১৭৮৭ সালের আগে এটি ময়মনসিংহের উপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে বয়ে যেত‌। পরবর্তীতে এর নতুন শাখা নদীর সৃষ্টি হয়, যা যমুনা নামে পরিচিত। উৎপত্তিস্থল থেকে এর দৈর্ঘ্য ২৮৫০ কিলোমিটার। ব্রহ্মপুত্র নদ এর সর্বাধিক প্রস্থ ১০৪২৬ মিটার (বাহাদুরাবাদ)। এটিই বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। ব্রহ্মপুত্রের প্রধান শাখা যমুনা। ব্রহ্মপুত্রের আরেক শাখা নদী বানার।
ব্রহ্মপুত্র’র উৎপত্তি সম্বন্ধে কালিকা পুরাণে একটি আখ্যান আছে ৷ আসামের পূর্বদিকে মিসিমি পর্ব্বতের অগ্রভাগে ব্রহ্মকুণ্ড নামে একটি কুণ্ড আছে৷ এটি হিন্দুদের অতি পবিত্র তীর্থ৷ এই ব্রহ্মকুণ্ডতেই পরশুরাম পাপের থেকে উদ্ধার পান, অর্থাৎ এখানেই তার হাত থেকে কুঠারটি খসে পড়ায় তিনি এর মহিমা দেখে এর জল অন্যের উপকারার্থে এর পারটি কাটিয়ে দেন ৷ ফলত এর জল দেশ-দেশান্তরে যায় ৷ এইভাবে ব্রহ্মপুত্র নদীর উৎপত্তি হয় ৷
এই ব্রহ্মপুত্র নদ ময়মনসিংহ হয়ে বন্দর উপজেলা ও সোনারগাঁও উপজেলার তথা উভয়ের বুক চিরে প্রবাহিত হয়ে সোনারগাঁও’র শম্ভুপুরা গ্রামে ইতি টেনে তার একটি মোহনা হিসেবে সাক্ষ্য বহন করছে। (সম্মানি পর্যটক মহলকে এই মোহনাকে এক নজরে দেখার অনুরোধ করছি)। সোনারগাঁওয়ের অপরদিক হলো নদের পশ্চিম পাড়। তারি পশ্চিম পাড়ের কাইকারটেক ব্রিজ হতে কলাগাছিয় বাজার পর্যন্ত সুপ্রশস্ত একটি নীরব-নির্জন একটা রাস্তা। যার দ’পাশে ঘনপল্লব বিশিষ্ট কাঠমালতী খ্যাত সারি সারি গসছ। কেউ উল্লেখিত রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকলে নদের সৌন্দর্যময় আঁকাবাঁকার মর্মার্থ অনুভূত হবে। কাইকারটেকের ব্রিজটি দোকান-পাটে সুসজ্জিত একটি চিত্ত বিনোদনমূলক পর্যটক বলয়। নদের কোল ঘেঁষা বালুচর গ্রামে রয়েছে মনোমুগ্ধকর মনোরঞ্জক একটি “আনন্দ রিভারভিউ এ্যাণ্ড রিসোর্ট”। আরো একটু বাড়িয়ে গেলে মিলবে মন্দিরসম্বলিত হিন্দুধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় স্নানঘাট নামে খ্যাত ঐতিহাসিক সাবদী বাজার যা স্বস্তির নি:শ্বাস ছাড়ার এক নিরাপদ স্পট। আর একটু পরেই লোকনাথ মন্দির যেখানে দূরদূরান্ত থেকে বহু সনাতনধর্মাবলম্বীরা পূজো পার্বন সম্পন্ন করতে আসে। এইতো কিছু সামনে হাজরাদী গ্রামস্থ ‘গ্রীণল্যাণ্ড গার্ডেন পার্ক’ যা কুঞ্জ বাগানে ভরপুর। এখান থেকে বেশ কিছু দূর পর্যন্ত নদ পাড়ের প্রান্তসীমায় সাজানো রয়েছে টুল টেবিল। এখানে বসে নদের কলোছলো ধ্বনির মর্মবাণী অনুধাবন করা যায়। জীবনের সকল ক্লান্তি, সকল শ্রান্তি, সকল ব্যদনার গল্প নদের সাথে বিনিময় করে নিষ্কলুষ সমাধান পাওয়া যায়। মলয় ও পূবালী সমীরণের নির্মল মমতায় সিক্ত হওয়া যায়। কখনো-সখনো নদ তরঙ্গের নৃত্য দোলা আত্মভোলা করে তোলে। এখানে রঙতলিতে আঁকা নকশাল নৌকা ভ্রমণেরও সুব্যস্থা রয়েছে। এককথায় অপরূপা রূপসী বাংলার অনুপম সৌন্দর্যে ভরপুর একটি অংশবিশেষ। এখানকার দোকান-পাটগুলোতে মুখরোচক বাহারি খাবারের সুব্যস্থাও রয়েছে। মনোরঞ্জনের অনন্য অন্যতম এক বিশেষ অংশ হলেও সূর্য নামক শাসকের অন্তরালে সেখানে অভিসারছলে আসা কিছু জুটিদের মধ্যে অশোভন কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হয় তাই আগত সচেতন মহলের মানুষের চোখের আলোকে গুটিয়ে মস্তক অবনত করে হাঁটতে হয়।



একটি মন্তব্য করুন

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *