মজুরি বাড়ানোর দাবিতে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা, বন্ধ ১২ কারখানা, আশুলিয়ায় ছুটি ৩০টিতে

পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও সাভারের আশুলিয়ায় শ্রমিক বিক্ষোভ, ভাঙচুর, সংঘর্ষ এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ১২টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে, আশুলিয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৩০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কও প্রায় ছয় ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিল। পরে রাত ৮টার দিকে ওই মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধ এবং বকেয়া বেতন পরিশোধসহ বিভিন্ন দাবিতে এই আন্দোলন চলছে। শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক বাজারে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি, ইউরোপে আন্দোলন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপের মধ্যে নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লে রপ্তানি ও ক্রয়াদেশ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে আন্দোলনের কারণে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হলে শিল্প খাতের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
তবে শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য, শ্রমিকদের মূল দাবি মজুরি বৃদ্ধি। এ বিষয়ে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিলে আন্দোলন ও অসন্তোষ কমে আসবে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য আজ নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে।
গতকাল সকাল থেকেই ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। একপর্যায়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে সরে গিয়ে আন্দোলনকারীরা মিরপুর-১ নম্বরের মাজারসংলগ্ন বাজার ও মার্কেট এলাকায় ভাঙচুর চালান। এ সময় হিমালয় গার্মেন্টস ও বাগদাদ শপিং কমপ্লেক্সে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের সংঘর্ষ এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে ওই এলাকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানান, ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হবে। এরপর তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ব্যাপক যানজট ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে সড়কের ওপর মাটিভর্তি বস্তা, কাঠ ও বাঁশ ফেলে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে মহাসড়কের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দূরপাল্লার যানবাহনসহ বিভিন্ন ধরনের পরিবহন আটকে পড়ে। শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে ওই এলাকায় ১২টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পরে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা অবরোধের পর রাত ৮টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল আবার শুরু হয়।
এদিকে, সাভারের আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে কয়েকটি পোশাক কারখানায়। সাভার প্রতিনিধি জানান, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে গতকাল আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজার, আমতলা, নয়াপাড়া ও আশপাশের এলাকার পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন।
সকালে নাঈম নিটওয়্যারের শ্রমিকরা প্রথমে কারখানার ভেতরে কর্মবিরতি পালন করেন। পরে তাঁরা কারখানা থেকে বেরিয়ে সড়কে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা আশপাশের কয়েকটি কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে কন্টিনেন্টাল গার্মেন্টস, এআর জিন্স ও সিডব্লিউএসহ কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভ চলাকালে শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে শিল্প পুলিশের এক সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে নিরাপত্তার স্বার্থে আশুলিয়ার ৩০টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের একজন সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৈয়দ ফয়সাল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলাকালে ঘটনাস্থল থেকে হাতবোমা সদৃশ তিনটি বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে। কারা এসব বস্তু সেখানে বহন করে এনেছে কিংবা রেখে গেছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য আজ নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে। শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারাও শ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি মেনে নিয়েছেন। ফলে এ বিষয়ে আর কোনো বিরোধ থাকার কথা নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গতকাল রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম ভবনে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন এবং শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভাঙচুর কিংবা কারখানা বন্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে দেশের পোশাকশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করলেও বাইরে থেকে কিছু লোক এসে তাঁদের উত্তেজিত করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বৈঠকে শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও আন্দোলন নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান। ইন্ডাস্ট্রি অল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সভাপতি মীর আবুল কালাম আজাদ বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন এবং চলমান শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে তাঁদের সব দলীয় সভাপতি, সংসদ সদস্যসহ জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
তিনি জানান, রাজপথে চলমান অসন্তোষ, আন্দোলন ও অবরোধ নিরসনে তাঁরা দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তাঁদের জোটের পক্ষ থেকে সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিনিধি দেওয়া হচ্ছে। মজুরি বোর্ড গঠিত হলে বর্তমানে চলমান আন্দোলন ও অসন্তোষ কমে আসবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শুধু পোশাকশিল্পের মালিকরা নন, সরকারও শ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে উদ্বিগ্ন। সরকার ও মালিকপক্ষ যখন শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, তখন কার স্বার্থে এবং কারা আন্দোলন করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে কেন্দ্র করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পোশাকশিল্পাঞ্চলগুলোতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা রপ্তানিমুখী এই শিল্পের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও বকেয়া পাওনা নিশ্চিত করার দাবি, অন্যদিকে উৎপাদন সচল রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ—দুই দিকই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি হলে পরিস্থিতি শান্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা। তবে শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।