হাফিজুর রহমানকে ঘিরে পশু খাদ্যে সিন্ডিকেটের অভিযোগ

প্রকাশিত: 7:41 pm, November 3, 2026 | আপডেট: 7:41 pm,

হাফিজুর রহমানকে ঘিরে পশু খাদ্যে সিন্ডিকেটের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিনিধি: একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর পশুখাদ্য সরবরাহের কাজ করছেন একজন ঠিকাদার। সময়ের হিসাবে প্রায় ২৬ বছর। কখনো বিএনপি সরকারের আমল, কখনো আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। সরকার বদলেছে, কিন্তু ঠিকাদারি কার্যক্রম থেমে থাকেনি। এরই মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে সিন্ডিকেট গড়ে সরকারি পশুখাদ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ। প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, নাকি দরপত্রের বিশেষ কোনো সমীকরণ কোনটি তাঁকে বারবার কাজ পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে?

 

অভিযোগের কেন্দ্রে ঠিকাদার মো. হাফিজুর রহমান। তাঁকে ঘিরে রয়েছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক ২৬ বছরের ঠিকাদারি, পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্রে অংশগ্রহণ এবং ২৫ থেকে ২৬টি খাদ্য উপকরণ এক লটে দরপত্র আহ্বান।

 

গত বছরের মে মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে হাফিজুর রহমান, হিলটন ও বিমলকে ঘিরে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগ তোলা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সমঝোতা করে হাফিজুর রহমান বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই), সাভারসহ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পশুখাদ্য সরবরাহের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাঁকে কাজ পাইয়ে দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহযোগিতার অভিযোগও ওঠে।

 

প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর ১৬ বছরের ঠিকাদারির কথা বলা হলেও সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট নথির ভিত্তিতে প্রায় ২৬ বছর ধরে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দরপত্রে তাঁর অংশগ্রহণের তথ্য সামনে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের আগেও বিএনপি সরকারের আমলে তিনি ঠিকাদারি করেছেন।

 

তাহলে তাঁকে শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করার ভিত্তি কী? অবশ্য দীর্ঘদিন ঠিকাদারি করাই যেমন অপরাধের প্রমাণ নয়, তেমনি দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অনিয়মের অভিযোগ থেকেও কাউকে দায়মুক্ত করে না। তাই দরপত্রে তাঁর কাজ পাওয়ার ধারাবাহিকতা ও প্রতিযোগিতার বাস্তব চিত্র যাচাই জরুরি।

 

বিতর্কের দ্বিতীয় অধ্যায় পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে। অভিযোগ, হাফিজুর রহমান নামে-বেনামে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নিতেন। তাঁর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক পাঁচজন পৃথক ব্যক্তি।

 

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মালিকানা আলাদা হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত পরিচালনা, আর্থিক সম্পর্ক কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ন্ত্রণ একই ব্যক্তির হাতে ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শুধু মালিকের নাম দেখেই অভিযোগ খারিজ করা যায় না। প্রয়োজন প্রকৃত মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের নথি যাচাই।

 

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি দরপত্রের শর্ত নিয়ে। প্রায় ২৫ থেকে ২৬টি খাদ্য উপকরণ একত্র করে একটি লটে দরপত্র আহ্বান করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ছোট ও বিশেষায়িত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

 

তবে বিএলআরআই কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, গবেষণার প্রয়োজনে প্রাণী ও পোল্ট্রির খাদ্য নির্দিষ্ট উপাদান ও অনুপাতে সময়মতো সরবরাহ করা অত্যন্ত জরুরি। একাধিক সরবরাহকারীর কাছ থেকে বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ করলে গবেষণার ধারাবাহিকতা ও খাদ্যের রেশন ফর্মুলেশন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই এক লটে দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

 

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, গবেষণার প্রয়োজনীয়তার আড়ালে প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার কোনো সুযোগ তৈরি হয়েছিল কি না? দরপত্রে কতটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল, কী ধরনের শর্ত ছিল এবং কারা কাজ পেয়েছে—এসব তথ্যই দিতে পারে প্রকৃত উত্তর।

 

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে উচ্চপর্যায়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কমিটি অভিযোগের সত্যতা পায়নি। তবে তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ও সুপারিশ পর্যালোচনা ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

 

ঠিকাদার মো. হাফিজুর রহমান তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ঠিকাদারি ব্যবসা করছেন। তাঁর সুনাম ক্ষুণ্ন করতে কেউ অপপ্রচার চালাতে পারে।

 

কেন্দ্রীয় গোপ্রজনন ও দুগ্ধ খামার, সাভারের পরিচালক ডা. শহিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ই-টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেট চালু রাখা অসম্ভব। তিনি হাফিজুর রহমানের কাজের প্রশংসাও করেন। একই ধরনের বক্তব্য দেন সরকারি ছাগল উন্নয়ন খামার, সাভারের পরিচালক ডা. জাহাঙ্গীর আলম।

 

বিএলআরআইয়ের সাবেক দুই মহাপরিচালক ডা. নজরুল ইসলাম ও ড. নথুরাম সরকার জানান, তাঁদের দায়িত্ব পালনকালে প্রতিষ্ঠানে সিন্ডিকেট কিংবা পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। বর্তমান মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুকের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

 

২৬ বছরের ঠিকাদারি, পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা এবং ২৫টি খাদ্য উপকরণ এক লটে দরপত্র—প্রতিটি বিষয়ই আলাদা করে যাচাই করার দাবি রাখে। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে নথির মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করতে হবে।

 

কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের দরপত্র কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক ক্ষেত্র নয়। জনগণের অর্থে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান শর্ত।

 

কেন্দ্রীয় গোপ্রজনন ও দুগ্ধ খামার, সাভারের পরিচালক ডা. শহিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ই-টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেট চালু রাখা অসম্ভব। তিনি ঠিকাদার হাফিজুর রহমানের কাজের প্রশংসা করেন। একই ধরনের বক্তব্য দেন সরকারি ছাগল উন্নয়ন খামার, সাভারের পরিচালক ডা. জাহাঙ্গীর আলম। বিএলআরআইয়ের সাবেক দুই মহাপরিচালক ডা. নজরুল ইসলাম ও ড. নথুরাম সরকারও তাঁদের দায়িত্ব পালনকালে সিন্ডিকেট বা পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ দেওয়ার সুযোগ ছিল না বলে জানান। বর্তমান মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

২৬ বছরের ঠিকাদারি, পাঁচ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা এবং ২৫টি খাদ্য উপকরণ এক লটে দরপত্র—প্রতিটি বিষয়ই স্বচ্ছ তদন্তের দাবি রাখে। অভিযোগ সত্য হলে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও প্রমাণসহ স্পষ্ট করতে হবে। সরকারি দরপত্র কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র নয়; জনগণের অর্থের প্রতিটি টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।



একটি মন্তব্য করুন

আপনার ইমেল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করা আছে *